• বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ১১:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
দেশের ক্ষুদ্র–মাঝারি উদ্যোক্তারা পাবেন ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ, যেসব যোগ্যতা লাগবে ৭ দিনেও নৌ যোগাযোগ নেই, সেন্টমার্টিনে ফুরিয়ে আসছে চালের মজুদ প্রতিবারের মতো ঈদে চ্যানেল আইতে নতুন ৭ চলচ্চিত্র জঙ্গি হামলার ঘৃণার বিরুদ্ধে অবস্থান পাকিস্তানি অভিনেত্রীকে খুশবু খানকে গুলি করে হত্যা মহিলাদের নামাযের পোশাক কেমন হবে! ঈদকে সামনে রেখে সোনাগাজীতে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির আগামী শুক্রবার মক্কায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি, হজযাত্রীদের মানতে হবে যে নির্দেশনা শীর্ষ কমান্ডার নিহতের জেরে ইসরায়েলে শতাধিক রকেট ছুড়ল হিজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়া জানাল হামাস ও পিআইজে

এমপি আনার  অধরাই থেকে যায় পাচার হওয়া স্বর্ণের আসল মালিক

অনলাইন ডেস্ক / ১৩ Time View
Update : সোমবার, ২৭ মে, ২০২৪

 

হত্যার পর আলোচনায় সীমান্তে গ্রেফতার স্বর্ণ বহনকারী ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার ভারতে নৃশংসভাবে খুন হওয়ার পর আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে সীমান্তের স্বর্ণ চোরাচালান। স্বাধীনতার পর ভারত থেকে শাড়ি কাপড়, অস্ত্র, বিড়ির পাতা ও মাদক পাচারের নিরাপদ গেটওয়ে হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত। আশির দশক থেকে ঝিনাইদহ সীমান্ত দিয়ে শুরু হয় ভিসিপি ও ভিসিআর পাচারের রমরমা ব্যাবসা। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ও কোটচাঁদপুর শহরের অনেকেই এই ব্যবসা করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।

পরবর্তীতে বেপরোয়াভাবে শুরু হয় ‘গোল্ড স্মাগলিং’ ব্যবসা। হাল আমলে ঝিনাইদহসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত পথে ভারতে স্বর্ণ পাচার বেড়েছে। ভরি বা গ্রাম নয়, পাচার হচ্ছে কেজি কেজি স্বর্ণ। বলা যায় সীমান্ত এখন স্বর্ণের খনি। এপারের বিজিবি এবং ওপারের বিএসএফ’র হাতে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ আটক হচ্ছে। কিন্ত বরাবরের মতো স্বর্ণের প্রকৃত মালিকরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাচারকৃত এসব স্বর্ণ প্রকৃত মালিক আসলে কে? তা বছরের পর বছর রহস্যাবৃত্তই থেকে যাচ্ছে।

জানা যায়, স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে ঝিনাইদহের মহেশপুরে খুনোখুনি ও একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বদলির ঘটনাও ঘটেছে। তাছাড়া স্বর্ণের চালান ধরিয়ে দেবার দ্বন্দ্ব নিয়ে চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি মহেশপুরের বাঘাডাঙ্গা গ্রামে গুলি করে শামিম হোসেন ও তার ভাতিজা মন্টুকে হত্যা করা হয়। তরিকুল ইসলাম আকালে নামে এক ব্যক্তির ৪ কেজি ৬৬৫ গ্রাম ওজনের সোনা ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে চাচা ভাতিজাকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। এ ঘটনার পর থেকে তরিকুল ইসলাম আকালে ভারতে পালিয়ে গেছেন। ঘটনার দিন সকালে মহেশপুরের ৫৮ বিজিবি মাটিলা সীমান্ত থেকে ওই স্বণের্র চালান জব্দ করার পর বিকালে জোড়া হত্যার ঘটনা ঘটে। তবে বিজিবির হাতে ধরা পড়া ওই স্বর্ণ আসলে কি তরিকুলের নাকি পর্দার আড়ালে থাকা গডফাদারের তা পুলিশী তদন্তে এখনো উঠে আসেনি।

এদিকে ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি রাতে মহেশপুর উপজেলার কালীগঞ্জ-জীবননগর সড়কের পুরন্দপুর নামক স্থানে সোনারতরী নামে একটি পরিবহন থেকে পাচার হওয়া ছয় কেজি ওজনের ৬৫ পিস স্বর্ণের বার ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় ডাকাতরা। এ ঘটনায় মহেশপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। এই ঘটনার সুত্র ধরে পুলিশের বিশেষ টিম গোপন খবরের ভিক্তিতে অভিযান চালিয়ে ঢাকার গাবতলী থেকে সোনারতরী পরিবহনের ম্যানেজার আশরাফুল আলম ওরফে পটলাকে ও কোটচাঁদপুর থেকে হারুন অর রশিদ ওরফে মিলনকে গ্রেফতার করে। এরপর তাদের কাছ থেকে ৩ কেজি-৪শ’ গ্রাম ওজনের ৩০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা ৪৭ পিস স্বর্ণের বার ডাকাতির কথা স্বীকার করে। ডাকাতদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক লুন্ঠিত ৪৭টি স্বর্ণের বারের মধ্যে বাকি ১৭টি স্বর্ণের বার মহেশপুরের তৎকালীন ওসি আহম্মেদ কবীর হোসেন গায়েব করে দেন। এ ঘটনায় ওই সময় মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ মামলার আইও মহেশপুর থানার এসআই আনিসুর রহমান ও এসআই নাজমুল হক, কনস্টেবল আব্দুল গাফফার, আসাদুল হক, ইমরান হোসেন, মনিরুজ্জামান, এইচ এম এরশাদ ও ওলিয়ার রহমানকে ক্লোজ করা হয়।
মহেশপুর ৫৮ বিজিবি সুত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা স্বর্ণের বার আটক হয়েছিল। আর ২০২৩ সালে আটক হয় ১৮ কোটি ৩২ লাখ টাকার স্বর্ণের বার। এসব ঘটনায় অন্তত ১০জন বহনকারীকে আটক করা হলেও পর্দার আড়ালে থাকা স্বর্ণের মালিকদের সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ২০২৪ সালে মহেশপুর থানার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ পাচারের ঘটনা ঘটেছে ৬টি।

এ বছরের ১৭ জানুয়ারি মাটিলা সীমান্ত থেকে ৪ কোজি ৬৬৫ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের বার উদ্ধার করে বিজিবি। এছাড়া ২ মার্চ একই সীমান্ত থেকে চার কোটি ৩৫ লাখ টাকার মালিকবিহীন ৫টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে। ১৬ এপ্রিল মহেশপুরের ছয়ঘরিয়া থেকে ৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা মুল্যের চার কেজি ৬৩ গ্রাম ওজেনের স্বর্ণের বার উদ্ধার ও দুই বহনকারী জসিম ও আব্দুল মান্নানকে আটক করে। গত ২৯ এপ্রিল মহেশপুরের নগরবন্নি থেকে ৩ কেজি ৫৫৮ গ্রাম ওজনের তিনটি স্বর্ণের বারসহ দুইজনকে আটক করা হয়।

গত ২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি বিজিবির দুটি দল গোপন সুত্রে খবর পেয়ে মহেশপুর উপজেলার পদ্মপুকুর ডিগ্রী কলেজ এলাকায় অভিযান চালিয়ে কসটেপে মোড়ানো ৪৬৬.৩৮ গ্রাম ওজনের চারটি স্বর্ণের বারসহ বহনকারী বায়েজিদকে আটক করে। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের মূল্য ৩৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। গত ১১ ফেব্রয়ারি মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর সীমান্তে অভিযানে সাড়ে ৯২ লাখ টাকা মুল্যের ১০টি স্বর্ণের বারসহ মফিজুর রহমান নামে এক পাচারকারীকে আটক করে বিজিবি। মফিজ যশোরের শার্শা উপজেলার গেড়িপাড়া গ্রামের আব্দুর রহিমের ছেলে। একই বছরের ৫ মে মহেশপুরের কাজীরবেড় গ্রাম থেকে দুই কেজি ৩৩১ গ্রাম ওজনের পৌনে দুই কোটি টাকার স্বর্ণের বার জব্দ হয়। ৯ জুন চুয়াডাঙ্গার হাসাদাহ থেকে দুই কোটি ২৪ লাখ টাকা মুল্যের ১৪টি স্বর্ণের বার জব্দ করে মহেশপুরের ৫৮ বিজিবি। ২৩ আগষ্ট মহেশপুরে পাতিলা সীমান্ত থেকে ৪ কেজি ৪৭৮ গ্রাম ওজনের ১৭টি স্বর্ণের বার উদ্ধার হয়, যার মুল্য ছিল চার কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২৬ ডিসেম্বর উথলী এলাকা থেকে ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা মুল্যের ৫ কেজি ১৯৭ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের বার উদ্ধার হয়। ২০২২ সালের পহেলা এপ্রিল মহেশপুরের করিমপুর গ্রাম থেকে সর্ববৃহৎ স্বর্ণের চালান আটক হয়। ওই দিন ৮ কোটি টাকা মুল্যের ৯৯টি স্বর্ণের বার জব্দ করে বিজিবি। একই বছরের ফেব্রয়ারি মহেশপুরের নিশ্চিন্তপুর গ্রাম থেকে বিজিবি ১০টি স্বর্ণের বার উদ্ধরি করে যার মুল্য ৭৪ লাখ টাকা। ২৭ এপ্রিল পিপুলবাড়িয়া থেকে ৯টি, গয়াসপুর থেকে ১০টি ও ২৯ এপ্রিল জুলুলী গ্রাম থেকে ৪০টি স্বর্ণের বার ধরা পড়ে। ওই বছরে মহেশপুরের গোপালপুর ও আকুন্দবাড়িয়া থেকে মহেশপুর বিজিবি ৮ কোটি টাকা মুল্যের ১১ কেজি ৭৩৮ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ জব্দ করে। এ সময় শুকুর আলী নামে এক বহনকারীকে আটক করে বিজিবি। ২০২২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর নস্তিপুর সীমান্ত থেকে ৫৮টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে বিজিবি। যার মূল্য ৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আটক করা হয় একজন পাচারকারিকে। ঐ দিন রাতে চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে দর্শনা সীমান্তে যাওয়ার পথে একটি প্রাইভেট কার তল্লাশী করে ৫টি স্বর্ণের বার উদ্ধা করে পুলিশ। আটক করা হয় কামরুল হাসান জুয়েল ও আরিফ হোসেন নামে দুই জনকে। ২৬ সেপ্টেম্বর গয়েশপুর সীমান্ত থেকে ভারতে পাচার কালে ৪টি স্বর্ণের বারসহ তাজমুল হোসেন নামে এক পাচারকারিকে আটক করে।

তথ্য নিয়ে জানা গেছে, সোনা চোরাচালীদের শাস্তির নজীরও কম। অনেক সময় সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে পাচারকারী বা বহনকারীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে রক্ষা পান। গত ১০ বছরে মাত্র একটি মামলার রায়ে দুইজনকে সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে। এই মামলায় ঝিনাইদহ সিনিয়র স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আদালতের তৎকালীন বিচারক মোঃ নাজিমুদ্দৌলা চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার দৌলতগঞ্জ দেয়াড়াপাড়ার শ্রী ষষ্টি কর্মকারের ছেলে সুনীল কর্মকার ও একই উপজেলার বাজারপাড়ার মৃত ফয়জুল্লাহ মোল্লার ছেলে ওবাইদুল্লাহকে কারাদন্ড প্রদান করেন। রায় সুত্রে বলা হয়, ২০১৫ সালের ৪ মার্চ কোটচাঁদপুর থানা পুলিশ জেআর পরিবহনে এক চোরাচালান বিরোধী অভিযান চালিয়ে ১ কেজি ১৫০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের গহনা জব্দ করে। এ সময় গ্রেফতার হয় সোনা বহনকারী সুনীল কর্মকার। তিনি জিজ্ঞাসাবাদে সোনার মালিক জীবননগরের ওবাইদুল্লাহ’র নাম বলেন।

সীমান্তের স্বর্ণের পাচার নিয়ে মহেশপুরের খালিশপুর ৫৮ বিজিবি’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজিজুস শহীদ গতকাল রোববার বিকালে মুঠোফোনে জানান, আমরা সীমান্ত থেকে সোনাসহ পাচারকারীদের আটক করে পুলিশে সোপর্দ করি। পুলিশ আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত করে দেখবে পাচারের সঙ্গে কারা জড়িত। তারপর তারা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

বিষয়টি নিয়ে মহেশপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান কাজল জানান, এ বছর মহেশপুর থানায় স্বর্ণ চোরাচালানের ৬টি মামলা হয়েছে। মামলাগুলো সবই চলমান ও তদন্তনাধীন। তিনি বলেন, এখনো পর্যন্ত উচু শ্রেণীর কাউকে তদন্তে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, বিজিবি যাদের আটক করে দেয়, তারা মূলত বহনকারী। স্বর্ণের হাত বদলিয়ে সীমান্তে আসতে আসতে নেপথ্যের কারিগরদের নাম বহনকারীরা বলতে পারে না। তাই বরাবরের মতো স্বর্ণের মালিকরা থেকে যায় পুলিশী নাগালের বাইরে। তিনি বলেন, তারপরও আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা