ঢাজা ০৭:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অদৃশ্য বন্দিশালায় রাজহাঁসের ডাক

সারফারাজ

আমি সারফারাজ। রাজহাঁস, পাখি, মাছ ধরা আর সাইকেল চালানোই আমার আনন্দ। প্রতিদিন বিকেলে খালের ধারে রাজহাঁসদের সঙ্গে খেলা করতাম। কিন্তু আজ সবকিছু থেমে গেছে। বন্ধুকে রক্ষা করতে গিয়ে ভেঙেছে আমার পা।

প্রথমে বেশ ভালো লাগছিল—পড়াশোনার ঝামেলা নেই, শুধু খাওয়া আর টিভি। কিন্তু কয়েকদিন যেতেই বুঝলাম, এ যেন এক অদৃশ্য বন্দিশালা। বাইরে রাজহাঁস ডাকছে, অথচ আমি শুয়ে আছি চার দেওয়ালের ভেতর বন্দি হয়ে।

সাত দিন পর

আমি মাকে বললাম—
“মা, আমাকে একটু বারান্দায় নিয়ে চলো। বাইরের আলো দেখি না, মনটা ঘরেই মরে যাচ্ছে। আমার পাখিগুলোকে দেখলে হয়তো ভালো লাগবে।”

মায়ের হাত ধরে যখন বারান্দায় পৌঁছালাম, মনে হলো নতুন প্রাণ ফিরে পেলাম। খাঁচায় আমার প্রিয় পাখিরা—পিঙ্গ, নিঞ্জা, রয়, রকি, জ্যাক, জ্যাকি, মিঙ্গ, নিঙ্গ, ডিসনি, বর্ণা আর টুনি। তাদের সঙ্গে এসেছে আরও তিনজন নতুন অতিথি।

ওদের ডানা ঝাপটানো, ছোট্ট চঞ্চলতা দেখে বুক ভরে উঠল। আমি হাতে নিতে চাইছিলাম, কিন্তু মা গম্ভীর স্বরে বললেন—
“না বাবা, ধরা যাবে না।”

আমি চুপ করে তাকিয়ে রইলাম। ভেতরে ভেতরে ভাবছিলাম—পা ঠিক হলে লুকিয়ে লুকিয়ে ধরব ওদের।

ঠিক তখনই খালের দিক থেকে রাজহাঁসের ডাক ভেসে এলো। মনে হলো—ওরা আমাকে খুঁজছে, ডাকছে জোরে জোরে। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।

দিন গুনতে গুনতে একুশ দিন কেটে গেল। আশা করছিলাম ডাক্তার বলবেন—“এবার হাঁটতে পারবে।”
কিন্তু তিনি বললেন—“আরও একুশ দিন শুয়ে থাকতে হবে।”

চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। মনে হলো—আমি কি আর কখনো হাঁটতে পারব না? রাজহাঁসগুলোকে ছুঁতে পারব না? প্রকৃতির সঙ্গে মিশে খেলতে পারব না?

অপেক্ষার দিনগুলো

আজ ২৮ দিন হয়ে গেল। প্রতিদিন রাজহাঁসের ডাক শুনি, কিন্তু দেখতে পারি না। সবাই বাইরে যায়, আবার ফিরে আসে—শুধু আমিই পারি না।

নানা ভাইয়া বের হচ্ছিলেন, আমি বললাম—
“নানা ভাইয়া, আমি রাজহাঁসগুলোকে খুব মনে করি।”
তিনি হেসে বললেন—
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”

রাতে ফিরে এসে বললেন—
“ওরাও তোমায় মনে করে।”
মনে মনে ভাবলাম—আমি তো বড় হয়েছি, বোকা নই। রাজহাঁস তো কথা বলতে পারে না! নানার কথা শুনে কষ্ট পেলাম।

আপুকে বললাম—“তুমি ছবি তুলে আনবে? একটা ভিডিও করবে?”
আপু বলল যাবে, কিন্তু যায়নি।
মাকে বললাম—“তুমি তবে ছবি তুলে আনো।”
মা ফিরে এসে বললেন—“পারিনি, রাজহাঁসগুলো দূরে ছিল।”

মনটা ভেঙে গেল। সবাই যেন অজুহাতে ব্যস্ত, কেউ আমার কষ্ট বোঝে না।

৩৫তম দিন

কতদিন মাটিতে পা রাখিনি, খালের গাপ্পি মাছ ধরিনি, একটা সবুজ পাতা ছুঁইনি।
আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—
যদি আমারও ডানা থাকত! আমি উড়ে যেতাম নীল আকাশে, হারিয়ে যেতাম সবুজ অরণ্যে।

কিন্তু কিছুই পারছি না।
মনে হচ্ছে জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে।

আমি মুক্তি চাই—এই অদৃশ্য বন্দিশালা থেকে মুক্তি চাই।

৪২ দিন পর

ডাক্তার দেখালাম। তিনি বললেন—
“এখন থেকে হাঁটতে পারবে, তবে সাবধানে থাকতে হবে। প্রতিদিন ক্যালসিয়াম খাবে, দৌড়াদৌড়ি একদম নয়।”

আমার ভীষণ খারাপ লাগল। কত নিয়ম, কত বাঁধন!
ডান পা শুকিয়ে গেছে, অসার মনে হচ্ছে। হাঁটার চেষ্টা করেও স্বাভাবিকভাবে পারছিলাম না।

তবুও বাড়ি ফেরার পথে খালের ধারে দাঁড়ালাম। বুক ধড়ফড় করছিল—আজ কি ওদের দেখতে পাব?

দূর থেকে রাজহাঁসগুলোকে দেখলাম। আমি ডাক দিলাম—
“প্যাক… প্যাক…”

অবাক হয়ে দেখলাম, তারা সাঁতার কেটে কেটে ছুটে এলো আমার দিকে।
জলে ঢেউ উঠল, যেন আমাকে বুকে টেনে নিল তারা।

আমার চোখ ভিজে গেল। বুঝলাম—রাজহাঁসগুলো আমাকে ভুলে যায়নি।

আমি মুক্তি পেয়েছি…
এই অদৃশ্য বন্দিশালা থেকে সত্যিই মুক্তি পেয়েছি আজ।
সৃষ্টিকর্তা আমাকে আবার জীবন উপহার দিয়েছেন।

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

বক্তব্য দিতে দিতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবুল হাশেম

অদৃশ্য বন্দিশালায় রাজহাঁসের ডাক

সপ্রকাশিত হয়েছে: ০১:৩১:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫

আমি সারফারাজ। রাজহাঁস, পাখি, মাছ ধরা আর সাইকেল চালানোই আমার আনন্দ। প্রতিদিন বিকেলে খালের ধারে রাজহাঁসদের সঙ্গে খেলা করতাম। কিন্তু আজ সবকিছু থেমে গেছে। বন্ধুকে রক্ষা করতে গিয়ে ভেঙেছে আমার পা।

প্রথমে বেশ ভালো লাগছিল—পড়াশোনার ঝামেলা নেই, শুধু খাওয়া আর টিভি। কিন্তু কয়েকদিন যেতেই বুঝলাম, এ যেন এক অদৃশ্য বন্দিশালা। বাইরে রাজহাঁস ডাকছে, অথচ আমি শুয়ে আছি চার দেওয়ালের ভেতর বন্দি হয়ে।

সাত দিন পর

আমি মাকে বললাম—
“মা, আমাকে একটু বারান্দায় নিয়ে চলো। বাইরের আলো দেখি না, মনটা ঘরেই মরে যাচ্ছে। আমার পাখিগুলোকে দেখলে হয়তো ভালো লাগবে।”

মায়ের হাত ধরে যখন বারান্দায় পৌঁছালাম, মনে হলো নতুন প্রাণ ফিরে পেলাম। খাঁচায় আমার প্রিয় পাখিরা—পিঙ্গ, নিঞ্জা, রয়, রকি, জ্যাক, জ্যাকি, মিঙ্গ, নিঙ্গ, ডিসনি, বর্ণা আর টুনি। তাদের সঙ্গে এসেছে আরও তিনজন নতুন অতিথি।

ওদের ডানা ঝাপটানো, ছোট্ট চঞ্চলতা দেখে বুক ভরে উঠল। আমি হাতে নিতে চাইছিলাম, কিন্তু মা গম্ভীর স্বরে বললেন—
“না বাবা, ধরা যাবে না।”

আমি চুপ করে তাকিয়ে রইলাম। ভেতরে ভেতরে ভাবছিলাম—পা ঠিক হলে লুকিয়ে লুকিয়ে ধরব ওদের।

ঠিক তখনই খালের দিক থেকে রাজহাঁসের ডাক ভেসে এলো। মনে হলো—ওরা আমাকে খুঁজছে, ডাকছে জোরে জোরে। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।

দিন গুনতে গুনতে একুশ দিন কেটে গেল। আশা করছিলাম ডাক্তার বলবেন—“এবার হাঁটতে পারবে।”
কিন্তু তিনি বললেন—“আরও একুশ দিন শুয়ে থাকতে হবে।”

চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। মনে হলো—আমি কি আর কখনো হাঁটতে পারব না? রাজহাঁসগুলোকে ছুঁতে পারব না? প্রকৃতির সঙ্গে মিশে খেলতে পারব না?

অপেক্ষার দিনগুলো

আজ ২৮ দিন হয়ে গেল। প্রতিদিন রাজহাঁসের ডাক শুনি, কিন্তু দেখতে পারি না। সবাই বাইরে যায়, আবার ফিরে আসে—শুধু আমিই পারি না।

নানা ভাইয়া বের হচ্ছিলেন, আমি বললাম—
“নানা ভাইয়া, আমি রাজহাঁসগুলোকে খুব মনে করি।”
তিনি হেসে বললেন—
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”

রাতে ফিরে এসে বললেন—
“ওরাও তোমায় মনে করে।”
মনে মনে ভাবলাম—আমি তো বড় হয়েছি, বোকা নই। রাজহাঁস তো কথা বলতে পারে না! নানার কথা শুনে কষ্ট পেলাম।

আপুকে বললাম—“তুমি ছবি তুলে আনবে? একটা ভিডিও করবে?”
আপু বলল যাবে, কিন্তু যায়নি।
মাকে বললাম—“তুমি তবে ছবি তুলে আনো।”
মা ফিরে এসে বললেন—“পারিনি, রাজহাঁসগুলো দূরে ছিল।”

মনটা ভেঙে গেল। সবাই যেন অজুহাতে ব্যস্ত, কেউ আমার কষ্ট বোঝে না।

৩৫তম দিন

কতদিন মাটিতে পা রাখিনি, খালের গাপ্পি মাছ ধরিনি, একটা সবুজ পাতা ছুঁইনি।
আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—
যদি আমারও ডানা থাকত! আমি উড়ে যেতাম নীল আকাশে, হারিয়ে যেতাম সবুজ অরণ্যে।

কিন্তু কিছুই পারছি না।
মনে হচ্ছে জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে।

আমি মুক্তি চাই—এই অদৃশ্য বন্দিশালা থেকে মুক্তি চাই।

৪২ দিন পর

ডাক্তার দেখালাম। তিনি বললেন—
“এখন থেকে হাঁটতে পারবে, তবে সাবধানে থাকতে হবে। প্রতিদিন ক্যালসিয়াম খাবে, দৌড়াদৌড়ি একদম নয়।”

আমার ভীষণ খারাপ লাগল। কত নিয়ম, কত বাঁধন!
ডান পা শুকিয়ে গেছে, অসার মনে হচ্ছে। হাঁটার চেষ্টা করেও স্বাভাবিকভাবে পারছিলাম না।

তবুও বাড়ি ফেরার পথে খালের ধারে দাঁড়ালাম। বুক ধড়ফড় করছিল—আজ কি ওদের দেখতে পাব?

দূর থেকে রাজহাঁসগুলোকে দেখলাম। আমি ডাক দিলাম—
“প্যাক… প্যাক…”

অবাক হয়ে দেখলাম, তারা সাঁতার কেটে কেটে ছুটে এলো আমার দিকে।
জলে ঢেউ উঠল, যেন আমাকে বুকে টেনে নিল তারা।

আমার চোখ ভিজে গেল। বুঝলাম—রাজহাঁসগুলো আমাকে ভুলে যায়নি।

আমি মুক্তি পেয়েছি…
এই অদৃশ্য বন্দিশালা থেকে সত্যিই মুক্তি পেয়েছি আজ।
সৃষ্টিকর্তা আমাকে আবার জীবন উপহার দিয়েছেন।