
ঢাকার সকালটা আজ কেবল শীতল নয়, ভারীও। ঘন কুয়াশায় ঢাকা জিয়া উদ্যানের ভেতর যেন নেমে এসেছে এক গভীর নীরবতা। গাছপালার ফাঁক গলে সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছাতে না পারলেও একটি জায়গায় মানুষের উপস্থিতি স্পষ্ট—বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল। কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে-মুখে ভেসে উঠছে শোক, ভালোবাসা আর স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস।
দাফনের চার দিন পেরিয়ে গেছে। সময় এগিয়েছে, কিন্তু মানুষের টান কমেনি। বরং প্রতিদিন ভোর হতেই রাজধানীর নানা প্রান্ত ও দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে মানুষ আসছেন প্রিয় নেত্রীর কবর জিয়ারতে। কারও হাতে গোলাপ, কারও হাতে গাঁদা, আবার কেউ এসেছেন খালি হাতে—ভেতরে শুধু দোয়া আর অশ্রু নিয়ে।
সমাধিস্থলের সামনে দাঁড়ালে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ মানুষের চলাচল। বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বয়স্ক মানুষ, নারী-পুরুষ—সবাই এখানে সমবেত। রাজনীতির পরিচয়ের বাইরে আজ সবাই এক পরিচয়ে আবদ্ধ—শোকাহত মানুষ।
ফুলে ফুলে ঢেকে যাচ্ছে কবরের বেদি। কেউ মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকছেন, কেউ চোখ বন্ধ করে প্রার্থনায় মগ্ন। পাশেই মাইকে ভেসে আসছে পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত। কুয়াশার মধ্যে সেই তিলাওয়াত যেন আরও গভীর হয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করছে।
সমাধিস্থলের পাশে ছোট একটি মঞ্চে বসে মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কোরআন পাঠ করছেন। বাতাসে ভেসে থাকা আয়াতের সুর পুরো পরিবেশকে আরও আবেগময় করে তুলেছে। কেউ কেউ চোখ মুছছেন, কেউ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে শুনছেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কর্মী মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়া তাঁর কাছে কেবল রাজনৈতিক নেত্রী নন।
“তিনি আমাদের বিশ্বাস, সাহস আর ভালোবাসার নাম। তাঁর আদর্শেই রাজনীতিতে এসেছি। তাই সুযোগ পেলেই তাঁর কবর জিয়ারতে আসি,”—বলতে বলতেই তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে।
রায়েরবাগ থেকে আসা রাফিউলের চোখেও ছিল আবেগের ছাপ। তিনি বলেন,
“বেগম খালেদা জিয়া নিজের জন্য কিছু চাননি। আজীবন দেশ, মাটি আর মানুষের কথা বলেছেন। আজ এখানে এসে মনে হচ্ছে, আমরা অন্তত আমাদের নেত্রীর কাছে সামান্য হলেও দায় শোধ করতে পারছি।”
এক তরুণ কর্মী দীর্ঘ সময় ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন কবরের পাশে। কথা বলতে চাইছিলেন না। পরে ধীরে ধীরে বলেন,
“খালেদা জিয়ার চলে যাওয়া এখনো বিশ্বাস করতে পারি না। শৈশব থেকে তাঁকে দেখে বড় হয়েছি, তাঁর ভাষণ শুনেছি, আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। তাঁর শূন্যতা আমাদের জন্য খুব কষ্টের।”
দিনের পর দিন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা এখানে এসে ফুলেল শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। কিন্তু এই সমাধিস্থল এখন আর কেবল একটি রাজনৈতিক নেত্রীর কবর নয়। এটি হয়ে উঠেছে স্মৃতি, বিশ্বাস আর ভালোবাসার এক নীরব আশ্রয়।
এই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ হারানো নেত্রীকে খোঁজেন, কেউ নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে নতুন করে দৃঢ় করেন। কেউ আবার সন্তানের হাত ধরে দেখিয়ে দেন দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কুয়াশা যত ঘনই হোক, মানুষের হৃদয়ের এই টান ঢেকে রাখা যায় না।
সময় এগিয়ে যায়, দিন বদলায়। কিন্তু এই সমাধিস্থলে মানুষের ফিরে আসা থামে না। ফুল শুকিয়ে যায়, নতুন ফুল আসে। চোখের জল মুছে যায়, আবার জমে ওঠে।
বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে কোটি মানুষের আবেগ, বিশ্বাস আর শেষ শ্রদ্ধার।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে গত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।