ঢাজা ০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘হ্যাঁ’-র ম্যান্ডেট, বাস্তবায়নের রাজনীতি: জুলাই সনদকে ঘিরে সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব

‘হ্যাঁ’-র ম্যান্ডেট, বাস্তবায়নের রাজনীতি: জুলাই সনদকে ঘিরে সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব

১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ‘হ্যাঁ’-র জয় নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মুহূর্ত। দীর্ঘ আলোচনার পর “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার)”-এর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন দেখিয়েছে ভোটাররা। কিন্তু গণভোটের ফল ঘোষণার পরই যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো-এই ‘হ্যাঁ’ কি প্রতিটি প্রস্তাবের বাধ্যতামূলক বাস্তবায়নের নির্দেশ, নাকি একটি নীতিগত অনুমোদন, যার ব্যাখ্যা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের দেখতে হবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার তিনটি স্তর: আইনি ভিত্তি, গণভোট, এবং সংসদীয় বাস্তবায়ন। রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির মাধ্যমে প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। গণভোটে জনসমর্থন নিশ্চিত হওয়ায় দ্বিতীয় ধাপও শেষ। এখন শুরু তৃতীয় ধাপ-নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করা। এই পর্যায়ে এসে স্পষ্ট হয়েছে, গণভোটের ফল যতটা স্পষ্ট, তার বাস্তব প্রয়োগ ততটা সরল নয়।

গণভোট বনাম সংসদীয় সার্বভৌমত্ব
নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সাংবিধানিক সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় শক্তি এখন তাদের হাতে। একই সঙ্গে বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, বিজয়ী দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এখানেই তৈরি হয়েছে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ দ্বন্দ্ব।
গণভোটে যে ৪৭টি সাংবিধানিক প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল, তার সবকটিতে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছিল না। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে-গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে কি সব প্রস্তাবে বাধ্যতামূলক সম্মতি, নাকি কেবল সংস্কারের নীতিগত অনুমোদন?
সংবিধানতত্ত্বের আলোকে বলা যায়, গণভোট সরাসরি জনমতের প্রতিফলন। কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের হাতে। যদি গণভোটের প্রশ্নগুলো ছিল প্যাকেজ আকারে-অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’- তাহলে ভোটাররা প্রতিটি প্রস্তাব আলাদাভাবে সমর্থন বা প্রত্যাখ্যানের সুযোগ পাননি। এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখন রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করেছে।

ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
জুলাই সনদের অন্যতম আলোচিত প্রস্তাব ছিল নির্বাহী ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস। বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব ন্যস্ত। নতুন প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে; বিশেষ করে কিছু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীন এখতিয়ার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এই প্রস্তাবগুলোতে তুলনামূলক ঐকমত্য থাকলেও, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ পৃথক রাখার প্রশ্নে মতভেদ ছিল। সনদে এই পৃথকীকরণের কথা থাকলেও বিএনপি তাদের ইশতেহারে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। সুতরাং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করলেও এই নির্দিষ্ট প্রস্তাব বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনিশ্চিত।
এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন-এই সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে এবং তা ইশতেহারেও প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে এই বিষয়ে বড় সংকট নেই। কিন্তু যেখানে নোট অব ডিসেন্ট ছিল, সেখানে বিজয়ী দলের অগ্রাধিকারই প্রাধান্য পাবে-এমন ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।

উচ্চকক্ষ: প্রতিনিধিত্বের দর্শন
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। গণভোটের ব্যালটে এই বিষয়টি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিন্তু বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে, উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে সংসদের আসন সংখ্যার ভিত্তিতে। অর্থাৎ যে দল যত বেশি আসন পাবে, উচ্চকক্ষেও তার অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
এখানে দুটি গণতান্ত্রিক নীতি মুখোমুখি-
প্রথমত, ভোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, যা গণভোটে অনুমোদিত;
দ্বিতীয়ত, আসনভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব, যা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিফলন।
যদি আনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়, তাহলে বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে বাড়বে। আর যদি আসনভিত্তিক হয়, তাহলে ক্ষমতাসীন দলের প্রাধান্য আরও সুসংহত হবে। প্রশ্ন হলো- গণভোটে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত একটি প্রস্তাব কি নির্বাচনী ইশতেহারের ব্যাখ্যায় পরিবর্তিত হতে পারে?

প্যাকেজ গণভোটের সীমাবদ্ধতা
গণভোটের ব্যালটে চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ভোটারদের একক ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। এতে সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো হারিয়ে গেছে। কোনো ভোটার যদি ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রস্তাব সমর্থন করেন কিন্তু উচ্চকক্ষের আনুপাতিক পদ্ধতিতে দ্বিমত পোষণ করেন, তার জন্য আলাদা মত প্রকাশের সুযোগ ছিল না।
এই কাঠামো গণভোটকে রাজনৈতিকভাবে কার্যকর করলেও আইনগতভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য করে তুলেছে। ফলে এখন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বলতে পারে- গণভোট সংস্কারের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে, কিন্তু প্রতিটি উপপ্রস্তাব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করেনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা
এই পুরো প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ মেটাতে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য ছিল জনমতের সরাসরি অনুমোদন নিয়ে সংস্কারের বৈধতা নিশ্চিত করা।
কিন্তু এখন প্রশ্ন-অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক বৈধতা কি নির্বাচিত সংসদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সামনে টিকবে? গণভোটের ফলাফলের ব্যাখ্যা নিয়ে যদি রাজনৈতিক মতপার্থক্য তীব্র হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত কাঠামো কতটা প্রভাবশালী থাকবে?

বিচারিক ব্যাখ্যার সম্ভাবনা
এই দ্বন্দ্ব যদি রাজনৈতিকভাবে সমাধান না হয়, তাহলে বিষয়টি বিচারিক ব্যাখ্যার দিকে যেতে পারে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের ফল কতটা বাধ্যতামূলক-এ প্রশ্ন আদালতে উঠলে একটি দৃষ্টান্তমূলক রায় আসতে পারে। তখন নির্ধারিত হবে, গণভোটের ‘হ্যাঁ’ কি প্যাকেজ অনুমোদন, নাকি প্রতিটি ধারার পৃথক বাধ্যবাধকতা।
তবে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার ইঙ্গিতও বহন করবে। সংবিধান সংস্কার ideally একটি ঐকমত্যভিত্তিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। যদি তা সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে এর স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা
বিএনপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে, তারা গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার বাস্তবায়নের নৈতিক দায় বহন করছে। অন্যদিকে, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি রক্ষার রাজনৈতিক দায়ও রয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে তাদের বড় পরীক্ষা।
যদি তারা গণভোটের সরাসরি অনুমোদিত বিষয়—যেমন উচ্চকক্ষের আনুপাতিক গঠন-পরিবর্তন করে, তাহলে বিরোধীরা এটিকে জনমতের অবমাননা হিসেবে তুলে ধরবে। আর যদি ইশতেহারের অগ্রাধিকার বিসর্জন দেয়, তাহলে নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তির প্রশ্ন উঠতে পারে।

উপসংহার: গণতন্ত্রের গভীরতা কোথায়?
গণতন্ত্র কেবল ভোটের অঙ্ক নয়; এটি আস্থার কাঠামো। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় দেখিয়েছে, জনগণ সংস্কারের পক্ষে। কিন্তু সংস্কারের প্রকৃতি, অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
জুলাই সনদ এখন একটি পরীক্ষার নাম- এটি কি সত্যিকারের ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে, নাকি নতুন করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রাধান্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে?
১৮০ কার্যদিবসের সময়সীমা দ্রুত কেটে যাবে। এই সময়ের মধ্যে যদি স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও আন্তরিকতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে জুলাই সনদ একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে। আর যদি তা ব্যাখ্যার জটিলতায় আটকে যায়, তাহলে ‘হ্যাঁ’–র ঐতিহাসিক ম্যান্ডেটও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে।
সবশেষে, গণভোট একটি দরজা খুলেছে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কোন পথে হাঁটা হবে- তা নির্ধারণ করবে রাজনীতি, আইন ও নৈতিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সেই পথচলার ওপরই নির্ভর করছে।

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শহীদ ‍মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন ডা. জুবাইদা ও জাইমা রহমান

‘হ্যাঁ’-র ম্যান্ডেট, বাস্তবায়নের রাজনীতি: জুলাই সনদকে ঘিরে সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব

সপ্রকাশিত হয়েছে: ০৬:০৩:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘হ্যাঁ’-র ম্যান্ডেট, বাস্তবায়নের রাজনীতি: জুলাই সনদকে ঘিরে সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব

১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ‘হ্যাঁ’-র জয় নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মুহূর্ত। দীর্ঘ আলোচনার পর “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার)”-এর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন দেখিয়েছে ভোটাররা। কিন্তু গণভোটের ফল ঘোষণার পরই যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো-এই ‘হ্যাঁ’ কি প্রতিটি প্রস্তাবের বাধ্যতামূলক বাস্তবায়নের নির্দেশ, নাকি একটি নীতিগত অনুমোদন, যার ব্যাখ্যা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের দেখতে হবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার তিনটি স্তর: আইনি ভিত্তি, গণভোট, এবং সংসদীয় বাস্তবায়ন। রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির মাধ্যমে প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। গণভোটে জনসমর্থন নিশ্চিত হওয়ায় দ্বিতীয় ধাপও শেষ। এখন শুরু তৃতীয় ধাপ-নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করা। এই পর্যায়ে এসে স্পষ্ট হয়েছে, গণভোটের ফল যতটা স্পষ্ট, তার বাস্তব প্রয়োগ ততটা সরল নয়।

গণভোট বনাম সংসদীয় সার্বভৌমত্ব
নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সাংবিধানিক সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় শক্তি এখন তাদের হাতে। একই সঙ্গে বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, বিজয়ী দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এখানেই তৈরি হয়েছে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ দ্বন্দ্ব।
গণভোটে যে ৪৭টি সাংবিধানিক প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল, তার সবকটিতে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছিল না। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে-গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে কি সব প্রস্তাবে বাধ্যতামূলক সম্মতি, নাকি কেবল সংস্কারের নীতিগত অনুমোদন?
সংবিধানতত্ত্বের আলোকে বলা যায়, গণভোট সরাসরি জনমতের প্রতিফলন। কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের হাতে। যদি গণভোটের প্রশ্নগুলো ছিল প্যাকেজ আকারে-অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’- তাহলে ভোটাররা প্রতিটি প্রস্তাব আলাদাভাবে সমর্থন বা প্রত্যাখ্যানের সুযোগ পাননি। এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখন রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করেছে।

ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
জুলাই সনদের অন্যতম আলোচিত প্রস্তাব ছিল নির্বাহী ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস। বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব ন্যস্ত। নতুন প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে; বিশেষ করে কিছু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীন এখতিয়ার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এই প্রস্তাবগুলোতে তুলনামূলক ঐকমত্য থাকলেও, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ পৃথক রাখার প্রশ্নে মতভেদ ছিল। সনদে এই পৃথকীকরণের কথা থাকলেও বিএনপি তাদের ইশতেহারে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। সুতরাং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করলেও এই নির্দিষ্ট প্রস্তাব বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনিশ্চিত।
এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন-এই সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে এবং তা ইশতেহারেও প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে এই বিষয়ে বড় সংকট নেই। কিন্তু যেখানে নোট অব ডিসেন্ট ছিল, সেখানে বিজয়ী দলের অগ্রাধিকারই প্রাধান্য পাবে-এমন ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।

উচ্চকক্ষ: প্রতিনিধিত্বের দর্শন
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। গণভোটের ব্যালটে এই বিষয়টি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিন্তু বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে, উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে সংসদের আসন সংখ্যার ভিত্তিতে। অর্থাৎ যে দল যত বেশি আসন পাবে, উচ্চকক্ষেও তার অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
এখানে দুটি গণতান্ত্রিক নীতি মুখোমুখি-
প্রথমত, ভোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, যা গণভোটে অনুমোদিত;
দ্বিতীয়ত, আসনভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব, যা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিফলন।
যদি আনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়, তাহলে বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে বাড়বে। আর যদি আসনভিত্তিক হয়, তাহলে ক্ষমতাসীন দলের প্রাধান্য আরও সুসংহত হবে। প্রশ্ন হলো- গণভোটে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত একটি প্রস্তাব কি নির্বাচনী ইশতেহারের ব্যাখ্যায় পরিবর্তিত হতে পারে?

প্যাকেজ গণভোটের সীমাবদ্ধতা
গণভোটের ব্যালটে চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ভোটারদের একক ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। এতে সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো হারিয়ে গেছে। কোনো ভোটার যদি ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রস্তাব সমর্থন করেন কিন্তু উচ্চকক্ষের আনুপাতিক পদ্ধতিতে দ্বিমত পোষণ করেন, তার জন্য আলাদা মত প্রকাশের সুযোগ ছিল না।
এই কাঠামো গণভোটকে রাজনৈতিকভাবে কার্যকর করলেও আইনগতভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য করে তুলেছে। ফলে এখন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বলতে পারে- গণভোট সংস্কারের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে, কিন্তু প্রতিটি উপপ্রস্তাব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করেনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা
এই পুরো প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ মেটাতে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য ছিল জনমতের সরাসরি অনুমোদন নিয়ে সংস্কারের বৈধতা নিশ্চিত করা।
কিন্তু এখন প্রশ্ন-অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক বৈধতা কি নির্বাচিত সংসদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সামনে টিকবে? গণভোটের ফলাফলের ব্যাখ্যা নিয়ে যদি রাজনৈতিক মতপার্থক্য তীব্র হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত কাঠামো কতটা প্রভাবশালী থাকবে?

বিচারিক ব্যাখ্যার সম্ভাবনা
এই দ্বন্দ্ব যদি রাজনৈতিকভাবে সমাধান না হয়, তাহলে বিষয়টি বিচারিক ব্যাখ্যার দিকে যেতে পারে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের ফল কতটা বাধ্যতামূলক-এ প্রশ্ন আদালতে উঠলে একটি দৃষ্টান্তমূলক রায় আসতে পারে। তখন নির্ধারিত হবে, গণভোটের ‘হ্যাঁ’ কি প্যাকেজ অনুমোদন, নাকি প্রতিটি ধারার পৃথক বাধ্যবাধকতা।
তবে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার ইঙ্গিতও বহন করবে। সংবিধান সংস্কার ideally একটি ঐকমত্যভিত্তিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। যদি তা সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে এর স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা
বিএনপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে, তারা গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার বাস্তবায়নের নৈতিক দায় বহন করছে। অন্যদিকে, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি রক্ষার রাজনৈতিক দায়ও রয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে তাদের বড় পরীক্ষা।
যদি তারা গণভোটের সরাসরি অনুমোদিত বিষয়—যেমন উচ্চকক্ষের আনুপাতিক গঠন-পরিবর্তন করে, তাহলে বিরোধীরা এটিকে জনমতের অবমাননা হিসেবে তুলে ধরবে। আর যদি ইশতেহারের অগ্রাধিকার বিসর্জন দেয়, তাহলে নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তির প্রশ্ন উঠতে পারে।

উপসংহার: গণতন্ত্রের গভীরতা কোথায়?
গণতন্ত্র কেবল ভোটের অঙ্ক নয়; এটি আস্থার কাঠামো। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় দেখিয়েছে, জনগণ সংস্কারের পক্ষে। কিন্তু সংস্কারের প্রকৃতি, অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
জুলাই সনদ এখন একটি পরীক্ষার নাম- এটি কি সত্যিকারের ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে, নাকি নতুন করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রাধান্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে?
১৮০ কার্যদিবসের সময়সীমা দ্রুত কেটে যাবে। এই সময়ের মধ্যে যদি স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও আন্তরিকতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে জুলাই সনদ একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে। আর যদি তা ব্যাখ্যার জটিলতায় আটকে যায়, তাহলে ‘হ্যাঁ’–র ঐতিহাসিক ম্যান্ডেটও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে।
সবশেষে, গণভোট একটি দরজা খুলেছে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কোন পথে হাঁটা হবে- তা নির্ধারণ করবে রাজনীতি, আইন ও নৈতিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সেই পথচলার ওপরই নির্ভর করছে।

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক