• সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন
Headline
ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ চৌদ্দগ্রামে ‘হোটেল গ্রীণ ভিউ এন্ড সুইটস-০২’ উদ্বোধন টেকনাফে ২০ হাজার ইয়াবাসহ তিন মাদক কারবারি আটক শিক্ষায় এআই ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে গুগলের সহযোগিতা চাইলেন শিক্ষামন্ত্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল নগর গড়তে সরকার বদ্ধপরিকর ক্যাশমেমো ও মূল্যতালিকায় অনিয়ম, কালাইয়ে দুই সার ডিলারকে জরিমানা সরকারকে সহযোগিতা আমাদের কাম্য, বিরোধিতার নামে অস্থিরতা নয় ১০ সন্তান মানুষ করেও শেষ বয়সে ঠাঁই হলো গাছতলায়, বরগুনায় অসহায় বাবা-মায়ের করুণ পরিণতি পাঁচ সন্তানের মাকে বাঁচাতে আকুতি, চিকিৎসার খরচ জোগাতে অসহায় পরিবার

আইনি জটিলতা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে হুমকিতে দেশের পান রপ্তানি

বিশেষ প্রতিবেদক / ৩২৬ Time View
Update : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬
প্রতীকী ডিজিটাল চিত্র

এক বছরে রপ্তানি আয় কমেছে ৩৪.২১ শতাংশ; বিপাকে হাজারো কৃষক ও সাধারণ রপ্তানিকারক

বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা

বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য পান রপ্তানি খাত বর্তমানে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রশাসনিক জটিলতা, আদালতের স্থগিতাদেশ এবং বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতির কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে রপ্তানিকারকদের উত্থাপিত অতিরিক্ত অর্থ আদায় (চাঁদাবাজি) ও হয়রানির অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই রপ্তানি খাত সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের মোট পান রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে সৌদি আরবের একক বাজার থেকে। অথচ সরকারি নথি ও কূটনৈতিক যোগাযোগে ইতোমধ্যেই এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শুধু একটি বাজার নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি বড় উৎসও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এক বছরে রপ্তানি আয় কমেছে ৩৪.২১ শতাংশ

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে পান রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩২.৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২১.৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় ৩৪.২১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

একই সময়ে মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে ১ কোটি ৯১ লাখ ৮৭ হাজার ৩৫৮ মার্কিন ডলার এসেছে শুধু সৌদি আরব থেকে, যা মোট আয়ের প্রায় ৮৯.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এই বাজারে সামান্য বিঘ্নও পুরো রপ্তানি খাতকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

গত ৩০ মে ২০২৬ সৌদি আরবের কৃষিপণ্য আমদানিকারক সমিতি জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়ে জানায়, বাংলাদেশ থেকে পান রপ্তানিতে প্রশাসনিক জটিলতা ও চাঁদাবাজির অভিযোগের কারণে রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জুন ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল, জেদ্দার কমার্শিয়াল কাউন্সিলর সৈয়দা নাহিদা হাবিব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সরকারি চিঠিতে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের পান রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ সৌদি বাজারনির্ভর হওয়ায় এই বাজার সচল রাখা জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

ব্যবসা সহজ করতে সরকারের উদ্যোগ, পরে আইনি জটিলতা

রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করতে ৮ এপ্রিল ২০২৬ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০০৩ সালের পুরোনো নির্দেশনা বাতিল করে নতুন সার্কুলার জারি করে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকও অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে রপ্তানি-সংক্রান্ত নথি সহজভাবে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়।

কিন্তু ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট হলে আদালত সার্কুলারের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। ফলে রপ্তানি প্রক্রিয়ায় আবারও জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং রপ্তানিকারকদের অভিযোগ অনুযায়ী পুরোনো সমস্যাগুলো ফিরে আসে।

১৭ রপ্তানিকারকের অভিযোগ

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের সরকারি পত্রে উল্লেখ করা হয়, ১৭টি পান রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে যে, সমিতির কার্যক্রমের কারণে রপ্তানি প্রক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

ইপিবি তাদের পর্যালোচনায় উল্লেখ করে, বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং রপ্তানিকারকরা বিড়ম্বনার মুখে পড়ছেন।

কয়েকজন রপ্তানিকারকের অভিযোগ, আদালতের স্থগিতাদেশের পর সমিতির কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি আবারও বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—

  • রপ্তানি প্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্ব;
  • অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা চাঁদা আদায়ের চেষ্টা;
  • নতুন রপ্তানিকারকদের নিরুৎসাহিত করা;
  • বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সমিতির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মতে, পান একটি দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্য। রপ্তানিতে বিলম্ব মানেই চালান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য হারান, শ্রমিক কাজ হারান এবং বৈদেশিক ক্রেতাদের আস্থা কমে যায়।

তাদের দাবি, বিদ্যমান জটিলতার পরিবর্তে স্বচ্ছ, ডিজিটাল ও প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি ব্যবস্থা চালু করা হলে সাধারণ রপ্তানিকারকেরা সহজে পান রপ্তানি করতে পারবেন। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পান রপ্তানির এই সংকট কেবল একটি সমিতি বা কয়েকজন রপ্তানিকারকের সমস্যা নয়; এটি দেশের কৃষি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তাদের মতে, আদালতের নির্দেশনা মেনে দ্রুত নীতিগত জটিলতার সমাধান, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান এবং সাধারণ রপ্তানিকারকদের জন্য সহজ ও স্বচ্ছ রপ্তানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় সৌদি আরবের মতো কৌশলগত বাজার হারানোর পাশাপাশি হাজারো কৃষক, শ্রমিক ও রপ্তানিকারক চরম ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category