সম্পাদকীয় । বিশেষ মতামত
বিদ্যুৎ সংকট এখন আর কেবল আলো-ফ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি জাতীয় সংকট। গ্রাম থেকে উপজেলা, জেলা শহর থেকে শিল্পাঞ্চল—ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি থমকে যাচ্ছে উৎপাদনের চাকা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই সংকটের প্রভাব ধীরে ধীরে কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের ওপরও পড়তে পারে।
আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। কৃষকের জন্য সেচের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ যখন প্রয়োজনের সময়ে পাওয়া যায় না, তখন সেচপাম্প বন্ধ থাকে। কৃষককে বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। আবার প্রয়োজনীয় সময়ে সেচ দেওয়া সম্ভব না হলে ফসলের ফলন কমার আশঙ্কাও থাকে। একদিকে কৃষকের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদন অনিশ্চিত হচ্ছে—এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব বাজার ও ভোক্তার ওপরও পড়বে।
কিন্তু শুধু কৃষিই নয়, জেলা ও উপজেলা শহরকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও বিদ্যুৎ সংকটে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা রাইস মিল, অটো রাইস মিল, করাতকল, তেলকল, বরফকল, ওয়েল্ডিং কারখানা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান, বেকারি, মেটাল ওয়ার্কশপসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।
এসব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকা মানে শুধু কয়েক ঘণ্টার উৎপাদন বন্ধ থাকা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা, উদ্যোক্তার আয়, কাঁচামালের ব্যবহার, অর্ডার সরবরাহ এবং বাজারের চাহিদা। বিদ্যুৎ না থাকলেও প্রতিষ্ঠানের ভাড়া, শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি ও অন্যান্য স্থায়ী খরচ কিন্তু বন্ধ থাকে না। ফলে উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোক্তার লোকসান বাড়ে।
বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখতে পারে। কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পক্ষে দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালানো সহজ নয়। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতে একদিকে উদ্যোক্তার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে, অন্যদিকে ভোক্তার ওপরও মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—রপ্তানি। বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের একটি বড় অংশ সময়নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে করা চুক্তি বাস্তবায়নে সমস্যা হতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি চালান বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকেও দুর্বল করতে পারে।
আমরা মনে করি, বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু বিদ্যুৎ বিভাগের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি—সবকিছু জড়িত। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে শুধু মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না; শ্রমিকের আয় কমে, পরিবহন ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কাঁচামাল সরবরাহকারী ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহ কমে যায়। অর্থাৎ একটি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব একটি বড় অর্থনৈতিক চক্রে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে গ্রাম ও জেলা শহরের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। রাজধানী বা বড় শিল্পাঞ্চলের বাইরে যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো গড়ে উঠেছে, সেগুলো স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত হলে দেশের ভারসাম্যপূর্ণ শিল্পায়নের লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হবে।
এখন প্রশ্ন হলো—সমাধান কী?
প্রথমত, লোডশেডিং হলে তার একটি বাস্তবসম্মত ও পূর্বঘোষিত সময়সূচি থাকা উচিত। উদ্যোক্তা ও কৃষক অন্তত জানতে পারবেন কখন বিদ্যুৎ থাকবে এবং কখন থাকবে না। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং অনির্দিষ্ট সময় পর ফিরে আসা উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর।
দ্বিতীয়ত, কৃষি মৌসুমে সেচপাম্পকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একইভাবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন সচল রাখার জন্য প্রয়োজনভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা দরকার।
তৃতীয়ত, শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। কোথায় ঘাটতি, কোথায় সঞ্চালন সমস্যা এবং কোথায় বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—এসব তথ্য প্রকাশ্য ও নিয়মিত পর্যালোচনার আওতায় আনা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যুৎকে এখন আর শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিদ্যুৎ না থাকলে কৃষকের সেচ বন্ধ হয়, কারখানার মেশিন বন্ধ হয়, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, ব্যবসায়ীর লোকসান হয় এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমাদের মত হলো, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি লোডশেডিং ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সাজাতে হবে।
কারণ একটি দেশের অর্থনীতি শুধু রাজধানীর বড় কারখানায় তৈরি হয় না। গ্রামের কৃষকের জমি, উপজেলা শহরের ছোট মিল, জেলা শহরের ওয়ার্কশপ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কারখানা এবং লাখো শ্রমিকের ঘাম—সব মিলেই জাতীয় অর্থনীতির ভিত তৈরি হয়।
সেই ভিতের ওপর যদি বিদ্যুৎ সংকটের চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে উৎপাদনের চাকা থেমে যাওয়ার ঝুঁকি শুধু কৃষক বা উদ্যোক্তার নয়—পুরো দেশের।
জি. এম.ফারুক হোসেন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
দৈনিক একুশে সংবাদ