নাগরিক সেবা কি মানুষের অধিকার, নাকি পৌর কার্যালয়ের টেবিলে পড়ে থাকা একটি ফাইলের ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল? কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর পৌরসভায় নাগরিকদের ভোগান্তির চিত্র এখন এমনই—প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের প্রক্রিয়া শেষ হলেও শেষ ধাপে গিয়ে আটকে যাচ্ছে সেবা। আর সেই আটকে থাকার কারণ হিসেবে সামনে আসছে প্রশাসকের স্বাক্ষর নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা ও গড়িমসির অভিযোগ।
জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, হোল্ডিং-সংক্রান্ত কাগজপত্রসহ বিভিন্ন জরুরি নাগরিক সেবা নিতে এসে দিনের পর দিন পৌরসভায় ঘুরছেন সাধারণ মানুষ। সংশ্লিষ্ট শাখার প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হওয়ার পরও স্বাক্ষরের অপেক্ষায় পড়ে থাকছে ফাইল। ফলে একটি সনদ হাতে পেতে যেখানে স্বল্প সময় লাগার কথা, সেখানে অনেক নাগরিককে বারবার পৌর কার্যালয়ে এসে খোঁজ নিতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন বিদেশগামী ব্যক্তি, শিক্ষার্থী ও জরুরি দাপ্তরিক কাজে কাগজপত্র প্রয়োজন এমন মানুষজন। একটি কাগজ সময়মতো না পাওয়ায় কারও ভিসা-সংক্রান্ত কাজ আটকে যাচ্ছে, কারও ভর্তি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, আবার কারও গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পৌরসভার সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও প্রশাসকের স্বাক্ষরের জন্য ফাইল আটকে থাকে। প্রশাসকের উপস্থিতি ও স্বাক্ষর পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হয় নাগরিকদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নিয়মিত পৌর কর দিই, নির্ধারিত ফি দিই। তারপরও একটি কাগজের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। অফিসের কাজ শেষ, কিন্তু স্বাক্ষর না হওয়ায় কাগজ হাতে আসে না। নাগরিক হিসেবে এটা আমাদের জন্য চরম অপমানজনক।”
তাঁদের প্রশ্ন, একটি স্বাক্ষরের জন্য যদি নাগরিককে বারবার পৌরসভায় ছুটতে হয়, তাহলে নাগরিক সেবা ব্যবস্থার কার্যকারিতা কোথায়?
নাগরিক সেবার এমন ভোগান্তির মধ্যেই বাজিতপুর পৌরসভার আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়কবাতি। সন্ধ্যা নামার পর পৌরসভার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনেক ল্যাম্পপোস্টে বাতি নেই। কোথাও বাতি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, কোথাও আবার খুঁটি থাকলেও আলোর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে রাতের বেলায় পথচারী ও যানবাহন চলাচল হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, অন্ধকার সড়কে দুর্ঘটনার পাশাপাশি চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চললেও নষ্ট বাতি মেরামত কিংবা নতুন বাতি স্থাপনে দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে পৌরবাসীর মধ্যে।
পৌরবাসীর ক্ষোভের জায়গাটি এখানেই। নাগরিকদের কাছ থেকে নিয়মিত পৌরকর ও বিভিন্ন ফি আদায় করা হলেও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কেন এমন দীর্ঘসূত্রিতা—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, পৌরসভা কোনো ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়; এটি জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। ফলে নাগরিকদের সেবা পেতে দিনের পর দিন ঘুরতে হওয়া এবং একটি স্বাক্ষরের জন্য ফাইল পড়ে থাকা কোনোভাবেই স্বাভাবিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি হতে পারে না।
তাঁদের দাবি, প্রতিটি নাগরিক সেবার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা প্রকাশ ও বাস্তবায়ন, ফাইল নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর মনিটরিং এবং প্রশাসকের স্বাক্ষর-সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত দূর করতে হবে। একই সঙ্গে পৌর এলাকার সব নষ্ট সড়কবাতি দ্রুত সচল করে অন্ধকার সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে।
বাজিতপুর পৌরবাসীর প্রশ্ন এখন সরাসরি—নাগরিকের সময়ের মূল্য কে দেবে? একটি স্বাক্ষরের জন্য যে মানুষ দিনের পর দিন ঘুরছেন, তাঁর ভোগান্তির দায় কার? আর অন্ধকার সড়কে কোনো দুর্ঘটনা বা অপরাধ ঘটলে দায় নেবে কে?
নাগরিক সেবা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি মানুষের অধিকার। তাই ফাইলের গতি নয়, নাগরিকের প্রয়োজনকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে—এমনটাই প্রত্যাশা পৌরবাসীর।
এখন দেখার বিষয়, বাজিতপুর পৌর কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, নাকি ‘এক স্বাক্ষরের অপেক্ষা’ আর ‘অন্ধকার সড়ক’ই হয়ে থাকে পৌরবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতা।