টানা কর্মসূচিতে স্থবির অপারেশন, বাড়ছে কন্টেইনার জট ও ডেমারেজ
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্যিক রাজধানীর প্রবেশদ্বারখ্যাত চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি ও এনসিটি) ইয়ার্ড টেন্ডার ছাড়াই গোপনে বিদেশি কোম্পানি “ডিপি ওয়ার্ল্ড”-এর কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে বন্দর রক্ষা শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ।
কর্মবিরতির ফলে গত কয়েকদিন ধরে জাহাজ থেকে পণ্য ও কন্টেইনার ওঠানামা বন্ধ, ডেলিভারি কার্যক্রম স্থগিত এবং বন্দরের ইয়ার্ডে কন্টেইনার জট সৃষ্টি হয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ঐক্য পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ তারিখ থেকে টানা তিনদিন প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে কলম বিরতি পালন করা হয়। দাবি পূরণ না হওয়ায় সর্বশেষ গতকাল সোমবার ২৪ ঘণ্টা শাটডাউন কর্মসূচি দিয়ে কলম বিরতি পালন করেন আন্দোলনকারীরা।
এর আগে গত শনিবার থেকে টানা ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি এবং মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টা কর্মসূচির কারণে বন্দর কার্যক্রমে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়।
আন্দোলনকারীরা বন্দর চেয়ারম্যান, নিরাপত্তা পরিচালকসহ কয়েকজন কর্মকর্তার অপসারণের দাবি জানান। এ সময় তারা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে কালো পতাকা মিছিল বের করেন বলেও জানা গেছে।
ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির বলেন,
“সিন্ডিকেটের কমিশন বাণিজ্যের স্বার্থেই জাতীয় নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে এই চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমরা গত এক বছর ধরে বিদেশিদের কাছে বন্দর ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি।”
তিনি আরও জানান, এনসিটি ও সিসিটি ইয়ার্ড বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে শাটডাউন কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
ঐক্য পরিষদের দাবি, বর্তমানে প্রতি টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বাবদ আয় হয় ১৬২ ডলার। এর মধ্যে প্রতি কন্টেইনারে ৫৭ ডলার খরচ বাদ দিলে আয় থাকে ১০৫ ডলার।
কিন্তু বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হলে সরকারের আয় হবে প্রতি টিইইউএস কন্টেইনারে মাত্র ৬০ ডলার। এতে করে সরকারের প্রতি টিইইউএস কন্টেইনারে ক্ষতি হবে ৫৫ ডলার।
তারা জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আগামীকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রেখে কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রাম বন্দরে গত চারদিন ধরে আমদানি-রপ্তানি চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে আমদানি পণ্যচালান ডেলিভারি নিতে না পারায় আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে।
বন্দরের বর্তমান অচলাবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ-২৩৪)-এর সভাপতি কাজী খাইরুল বাশার মিল্টন বলেন,
“শিল্পখাতের রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে রমজান উপলক্ষে লাইটারেজ জাহাজ থেকে আমদানি ভোগ্যপণ্য খালাস নিতে না পারায় আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ডেমারেজ গুনতে হবে। এর প্রভাব পড়ে রমজানে পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যার মাসুল দিতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনের আগে টেন্ডারবিহীনভাবে বিদেশি কোম্পানির কাছে টার্মিনাল হস্তান্তর কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।”
এ প্রসঙ্গে কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া বলেন,
“বন্দর কর্মচারী ঐক্য পরিষদের কর্মবিরতির ফলে আমদানি-রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সরকারের রাজস্ব আহরণে ঘাটতি হচ্ছে, পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে সম্পৃক্ত সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী, ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী ও কর্মচারীসহ সকলের রুটি-রুজির ওপর আঘাত আসছে। জাতীয় স্বার্থে সরকার ও আন্দোলনকারী উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের যাবতীয় অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
রফিকুল ইসলাম মিলন, 











