যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রহর গুনছে। এর মধ্যেই যুদ্ধের প্রস্তুতির হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। একই সঙ্গে পাকিস্তানে পুনরায় দু’পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠেয় আলোচনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ সফরে যেতে প্রস্তুত। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে দ্বিতীয় দফা আলোচনা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

তবে তেহরানের ধর্মীয় নেতৃত্বাধীন সরকার এখনও অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি, বরং তারা অভিযোগ করেছে যে ইরানের বন্দর অবরোধ ও একটি জাহাজ জব্দের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ বলেন, ‘অবরোধ আরোপ করে ও যুদ্ধবিরতি ভেঙে ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনাকে আত্মসমর্পণের টেবিলে পরিণত করতে চান, অথবা তিনি নতুন করে সংঘাত শুরু করার অজুহাত খুঁজছেন।’

গালিবফ আরও বলেন, ‘হুমকির ছায়ায় আমরা আলোচনা মেনে নেব না। গত দুই সপ্তাহে আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন কৌশল দেখানোর প্রস্তুতি নিয়েছি।’

ইরানের বিপ্লবী গার্ড হুঁশিয়ারি দিয়েছে, অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া যে কোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

অন্যদিকে ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালীতে জাহাজে হয়রানি চালিয়ে ইরানই যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার জবাবে ইরান প্রায় পুরোপুরি এই পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।

জাহাজ শিল্প সংক্রান্ত গোয়েন্দা সাইট লয়েডস লিস্ট জানায়, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২০টি জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে।

মঙ্গলবার সাইটটি জানায়, ইরানের অন্তত ২০টির বেশি তথাকথিত ‘শ্যাডো ভেসেল’ মার্কিন অবরোধ অতিক্রম করেছে।

ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, এই অবরোধ ইরানকে ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং একটি ‘চুক্তি’ না হওয়া পর্যন্ত এটি চলবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ছাড় আদায়ে চাপ দিচ্ছে।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের আলোচনায় যোগ দেওয়ার কথা ছিল।

তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানে থাকার বিষয়ে একমত হয়েছিলাম।

যুদ্ধবিরতি শেষ হলে ‘অনেক বোমা বিস্ফোরণ শুরু হবে’ বলে তিনি সতর্ক করেন।

তিনি ব্লুমবার্গকে বলেন, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সম্ভাবনা ‘খুবই কম।’

সময়সীমা অনুযায়ী, তেহরান সময় মঙ্গলবার রাতেই যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কথা।

তবে ট্রাম্পের মতে, ওয়াশিংটন সময় অনুযায়ী তা বুধবার সন্ধ্যায় শেষ হবে।

এদিকে সম্ভাব্য সমঝোতার আশায় মঙ্গলবার তেলের দাম কমেছে আর বেশিরভাগ শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

যদিও তেহরান জানিয়েছে, তারা আলোচনায় যোগ দেবে কি না, সে ব্যাপারে এখনও কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি।

যুদ্ধবিরতির মধ্যে তেহরানে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরলেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩০ বছর বয়সী এক চিকিৎসক বলেন, ‘মঙ্গলবার কী হয়, দেখা যাক।’

৩৯ বছর বয়সী সাঘার বলেন, ‘সরকার আর যুদ্ধের চাপে মানুষ পিষ্ট। অর্থনীতি ভয়াবহ অবস্থায়।’

-ইসরাইল-লেবানন আলোচনাও শুরু-
এদিকে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে আলাদা একটি যুদ্ধবিরতি শুক্রবার ঘোষণা করা হয়েছে। এতে হিজবুল্লাহও অন্তর্ভুক্ত, যারা ইরানের সমর্থনে রকেট হামলা চালিয়ে লেবাননকে যুদ্ধে টেনে আনে।

দুই দেশের মধ্যে বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে দ্বিতীয় দফা আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
তবে সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রামে সাধারণ মানুষকে ফিরে না যেতে সতর্ক করেছে। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে।

সোমবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ লেবাননে এক ফরাসি শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে। ফ্রান্স এ ঘটনার জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করেছে।

হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যকার লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া লেবাননে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন বাহিনীর (ইউনিফিল) একটি চৌকির দিকে যাওয়ার পথে শনিবার তাদের ইউনিটটি অতর্কিত হামলার শিকার হলে ওই ফরাসি শান্তিরক্ষী নিহত ও আরও তিন জন আহত হন।

হিজবুল্লাহ নেতা হাসান ফাদলাল্লাহ বলেন, তারা ইসরাইলের নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ ভাঙার চেষ্টা চালাবে।
তবে তিনি যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার পক্ষেও মত দেন।

লেবাননের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে অন্তত ২হাজার ৩৮৭ জন নিহত হয়েছেন।

-পারমাণবিক ইস্যুতে মতবিরোধ-
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার বড় একটি বিষয় হচ্ছে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এটি হস্তান্তরে রাজি হয়েছে।

তবে ইরান তা অস্বীকার করেছে।

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই মজুত কোথাও সরানো হবে না।

মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের বিষয়টি কখনও আলোচনায় ওঠেনি।