এশিয়ান গেমস নারী হকির বাছাই পর্বে গ্রুপ সেরা হয়ে সেমিফাইনালে উঠে প্রথমবারের মতো এশিয়াডে খেলার সুযোগ পেয়ে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশের মেয়েরা। গতকাল ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় বাছাইয়ের ‘এ’ গ্রুপে নিজেদের শেষ ম্যাচে হংকং চায়নাকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারে উঠলো বাংলাদেশ জাতীয় নারী হকি দল। বিজয়ী দলের হয়ে নাদিরা এমা ও কণা আক্তার একটি করে গোল করেন। হংকংয়ের পক্ষে একমাত্র গোলটি করেন ল কা মুন মেলিসা।
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ আসর অলিম্পিক। এরপরই মাল্টি স্পোর্টস আসর হিসেবে বিবেচনা করা হয় এশিয়ান গেমসকে। ১৯৭৮ সাল থেকে এই গেমসে নিয়মিত অংশগ্রহণ করছে বাংলাদেশ। শুরু থেকেই পুরুষ হকি এশিয়াডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। তবে চলতি বছর সেপ্টেম্বরে জাপানের আইচি নাগোয়াতে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমসে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো বাছাই টুর্নামেন্ট খেলছে লাল-সবুজের নারী হকি দল। বাছাইয়ে প্রথম অংশগ্রহণেই বাজিমাত করলেন অর্পিতা পালরা। ‘এ’ গ্রুপের শীর্ষ দুই দলের প্রথমটি হয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছেন তারা। সেই সঙ্গে এশিয়ান গেমসের টিকিটও কেটেছে লাল-সবুজের মেয়েরা।
এশিয়ান হকি ফেডারেশনের (এএইচএফ) কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী বাছাই পর্ব থেকে ছয়টি দল আসন্ন জাপান এশিয়ান গেমসে খেলার সুযোগ পাবে। বাছাইয়ে নিজেদের প্রথম ম্যাচে চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ৫-৫ গোলে ড্র করার পর দ্বিতীয় ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৩-২ ব্যবধানে হারায় বাংলাদেশ। ফলে দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানেই ছিল লাল-সবুজরা। কাল গ্রুপের শেষ ম্যাচে হংকংয়ের বিপক্ষে ড্র করলেই অন্তত গ্রুপ রানার্সআপ হওয়া নিশ্চিত ছিল বাংলাদেশের। সেখানে হংকংকে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয়েই সেমিতে জায়গা করে নিলো কোচ জাহিদ হোসেন রাজুর শিষ্যরা। তিন ম্যাচ শেষে দুই জয় ও এক ড্রতে ৭ পয়েন্ট পেয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ।
কাল ম্যাচের শুরুতেই গোল করে এগিয়ে যায় হংকং চায়না। ম্যাচের ১ মিনিটে ল কা মুন মেলিসা ফিল্ড গোল করে দলকে এগিয়ে নেন (১-০)। আক্রণাত্মক হকি খেলে ম্যাচের ১০ মিনিটে ফিল্ড গোল করে বাংলাদেশকে সমতায় ফেরান নাদিরা এমা (১-১)। দ্বিতীয় কোয়ার্টারে দু’দলের কেউ গোল করতে পারেনি। তবে তৃতীয় কোয়ার্টারে কণা আক্তারের ফিল্ড গোলে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। ম্যাচের ৩৯ মিনিটে এমার বাড়িয়ে দেয়া বল হংকংয়ের গোলরক্ষক আটকানোর চেষ্টা করে সফল হননি। গোলরক্ষকের সামনে পড়া বলে স্টিক চালিয়ে দারুণ দক্ষতায় গোল করেন কণা (২-১)। এই কোয়ার্টারে পেনাল্টি কর্নার পেয়েও ব্যবধান বাড়াতে পারেনি লাল-সবুজরা। শেষ কোয়ার্টারে দুই দলই গোলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত জয় পেয়ে বাছাইয়ের সেমিতে উঠার পাশাপাশি এশিয়াড নিশ্চিত করেই টার্ফ ছাড়ে বাংলাদেশের মেয়েরা। ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতেন বাংলাদেশ দলের তন্নি খাতুন।
বাংলাদেশ হকির ইতিহাস বেশ পুরোনো হলেও নারীদের সিনিয়র জাতীয় দল কখনও ছিল না। এবারই বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন (বাহফে) নারীদের সিনিয়র জাতীয় দল গঠন করে। বিকেএসপির খেলোয়াড়রাই মূলত এই দলে খেলছে। প্রথমবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অংশ নিয়েই বাজিমাত করেছে সেই মেয়েরা। বাছাইয়ে হংকং চায়নাকে হারিয়ে জাপান এশিয়ান গেমসে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে দেশের নারী হকির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন নাদিরা এমা-কণা আক্তাররা। মেয়েদের এমন সাফল্যে জাতীয় নারী হকি দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। প্রতিমন্ত্রী এই জয়কে দেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করে দলের খেলোয়াড়, কোচ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশংসা করেন। কাল এক অভিনন্দন বার্তায় আমিনুল বলেন,‘ তিন ম্যাচের দু’টিতে জয় এবং এক ড্র নিয়ে ৭ পয়েন্ট অর্জন করে বাংলাদেশ কেবল সেমিফাইনালই নিশ্চিত করেনি, গ্রুপ চ্যাম্পিয়নও হয়েছে। নারী হকি দলের এই অদম্য স্পৃহা ও লড়াই করার মানসিকতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করেছে।’ প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, এশিয়ান গেমসের মতো এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরেও বাংলাদেশের মেয়েরা তাদের এই জয়ের ধারা বজায় রাখবে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশের ক্রীড়া মানোন্নয়নে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী টুর্নামেন্টের পরবর্তী ম্যাচগুলোর জন্য দলের সকলের সাফল্য ও মঙ্গল কামনা করেন।
এদিকে একই দিন গ্রুপের আরেক ম্যাচে উজবেকিস্তানের সঙ্গে ৩-৩ গোলে ড্র করে সেমিফাইনালের টিকিট কাটে চাইনিজ তাইপে। তিন ম্যাচে এক জয় ও দুই ড্রতে ৫ পয়েন্ট পেয়ে ‘এ’ গ্রুপ রানার্সআপ হয়েছে তারা। ফলে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছে ‘বি’ গ্রুপ রানার্সআপ সিঙ্গাপুরকে। অন্যদিকে চাইনিজ তাইপে পেয়েছে ‘বি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়াকে। আগামীকাল প্রথম সেমিফাইনালে তাইপে খেলবে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে। একই দিন দ্বিতীয় সেমিফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ সিঙ্গাপুর।