জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় টানা বৃষ্টির কারণে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার আলুর ক্ষেত পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। এতে মাঠে থাকা আলু দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং হাজার হাজার কৃষক আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। স্থানীয় কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী আলুর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি টাকা।
মাঠপর্যায়ের জরিপ অনুযায়ী, মোট আবাদি জমির প্রায় ২,৬৭২ হেক্টর, অর্থাৎ ১৯ হাজার ৯৫৩ বিঘা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতি বিঘায় গড়ে ৮০ মণ আলু উৎপাদন ধরে হিসাব করলে প্রায় ১৫ লাখ ৯৬ হাজার ২৪০ মণ আলু নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ আলুর দাম প্রায় ৫০০ টাকা ধরা হলে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৭৯ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কালাই উপজেলায় মোট ১০ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ করা হয়েছিল, যা স্থানীয় হিসাবে প্রায় ৭৯ হাজার ৭৯৬ বিঘা।
মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কৃষকরা আশা করেছিলেন, এবার আলুর ফলন আগের বছরের তুলনায় আরো ভালো হবে। সেই আশায় অনেক কৃষক অধিক খরচ করে আলুর আবাদও করেছিলেন। মৌসুমের শুরুতে কৃষকরা উৎপাদিত মোট জমির প্রায় তিন ভাগ আলু উত্তোলন করতে সক্ষম হন। তবে হঠাৎ করে গত কয়েক দিনের টানা ভারি বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার কারণে আলু উত্তোলনের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।এতে প্রায় ২ হাজার ৬৭২ হেক্টর জমির আলু মাঠে অবশিষ্ট থেকে যায়। এরই মধ্যে টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকার আলুর ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে মাঠে থাকা ওই প্রায় ২ হাজার ৬৭২ হেক্টর জমির আলু পানিতে ডুবে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে উপজেলার হাজারো কৃষক চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন এবং তাদের মধ্যে পচন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকরা জানান, দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও বিপুল পরিমাণ খরচ করে তারা আলুর চাষ করেছিলেন।
কিন্তু কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি তাদের সেই পরিশ্রমকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অনেক কৃষকই এখন অবশিষ্ট আলু দ্রুত উত্তোলন করতে পারছেন না, কারণ জমিতে পানি জমে থাকায় ক্ষেতের ভেতরে প্রবেশ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মাঠে থাকা আলু ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা দ্রুত সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে না দাঁড়ালে অনেকেই ভবিষ্যতে আলুর চাষে আগ্রহ হারাবেন। তাই বর্তমানে আলু চাষিদের জন্য এটি বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কা।
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম, ঋণ এবং বড় খরচের পরই তারা আলুর চাষ করেছেন। জমি প্রস্তুতি, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে প্রতি বিঘায় প্রচুর ব্যয় হয়েছে। কৃষক আব্দুল করিম বলেন, ‘আমরা অনেক আশা নিয়ে আলুর চাষ করেছি। কিন্তু কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে আমাদের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক আলু পচে যাচ্ছে। দ্রুত আলু তুলতে না পারায় আমাদের আর্থিক ক্ষতি বড় হচ্ছে।’
কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বিঘার খরচ প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এবার যদি সব আলু নষ্ট হয়, ঋণ শোধ করাও কঠিন হয়ে যাবে।’
উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো.হারুনুর রশিদ বলেন, ‘অসময়ের এই ভারি বৃষ্টি ফসলের জন্য বিশাল ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণের জন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সব তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করছি। সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা অবশ্যই নিশ্চিত করা হবে যাতে কৃষকরা অন্তত কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেন।
কালাই প্রতিনিধি 




















