ঢাজা ০২:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুনাট্য মঞ্চে রাজনীতির রঙ্গশালা

  • অনলাইন ডেস্ক
  • সপ্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৫২:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২২
  • ৩৯৩ শেয়ার

বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন ঘিরে আবার নতুন ষড়যন্ত্র ক্রমশ দানা বেঁধে উঠছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিশেষ অংশ লক্ষণীয়ভাবে তৎপর। তথাকথিত তৃতীয় শক্তিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার বিপজ্জনক চক্রান্ত চলছে বলে পর্যবেক্ষক মহলের অনেকের ধারণা।

দেশে যখনই নির্বাচনের একটা আবহ সৃষ্টি হয়, তখনই এই অশুভ মহল গর্ত থেকে মুখ বাড়ায়। সব সময়ের মতো আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত এই মহলটি ইতিমধ্যেই তাদের যোগাযোগের মাত্রা বাড়িয়েছে এবং মুখ হিসেবে ড. রেজা কিবরিয়ার মতো কাউকে কাউকে ব্যবহার করছে। এই সব মুখের সংখ্যা কিন্তু সঙ্গোপনে বাড়ছে। কোনো কোনো মুখস্থ মুখ আছে, সতত নিন্দাভাষণে মুখর কণ্ঠ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। মিডিয়ার কোনো কোনো অংশ এদের পর্দায় হাজির করিয়ে কিছু কটুবাক্য উচ্চারণের সুযোগ করে দেয়। আবার কেউ কেউ নিজের কথাটি অন্যের মুখে বসিয়ে নিরীহচিত্তে প্রতিক্রিয়া অবলোকন করতে থাকে। অবশ্য কথা বলার অধিকার তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বীকৃত অধিকার এবং সেটা সংবিধানেরও স্বতঃসিদ্ধ সত্য। তবে এই প্রসঙ্গে একটি মহাজন বাক্য স্মরণে রাখাও প্রয়োজন—তোমার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সীমানা যেন আমার কেশাগ্র স্পর্শ না করে। কিন্তু কোনো কোনো সময় দেখা যায় যে, এই লক্ষ্মণরেখাটিও লঙ্ঘিত হয়ে যাচ্ছে। ইদানীং আর একটি বিষয় খুব নীরবে মাথা তুলছে। তা হলো, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সুনির্দিষ্ট বিদেশি কূটনৈতিক মহলের তৎপরতা। কিন্তু এবার তাদের তৎপরতা শুধু নির্বাচন পরিমণ্ডলের মধ্যেই সীমিত ছিল না; যারা এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ নিয়ে বিশেষ উদ্দেশ্য ফলপ্রসূ করার আয়োজন করেছিল তাদের প্রতিও ঐ মহলের সস্নেহ দৃষ্টিপাতও কিন্তু পরিলক্ষিত হচ্ছিল। এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে বেশ কিছু অন্তর্ঘাতমূলক চক্রান্ত তো ছিলই—বিশেষ করে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে বিপুল অর্থের প্লাবন, অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীকে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ দিয়ে নৌকা প্রতীক সম্পর্কে ভুল ধারণা জনমনে ছড়িয়ে দেওয়া। এসব ঘটনা দলের ভেতরে ঢুকে পড়া এবং প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে দলের সাংগঠনিক স্তরে অনুপ্রবেশকারীর ষড়যন্ত্রেরই ফসল। আর এটাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু সরকারবিরোধী প্রতিষ্ঠান, নামসর্বস্ব সাইনবোর্ডকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংগঠনকে বাছাই করে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছে বেশ কিছু কূটনৈতিক মিশন এবং এই যোগাযোগকে চিত্রিত করছে ‘রুটিন ওয়ার্ক’ হিসেবে। চা-চক্র, গোপন লেনদেন, অপ্রচারিত কার্যক্রম, তথ্য চালাচালি সবই এই তথাকথিত ‘রুটিন ওয়ার্ক’-এর অন্তভু‌র্ক্ত হয়ে যায়। আর এই সূত্র ধরেই জন্ম হয়েছে আন্তর্জাতিক ফরমান। সরকারের কিংবা প্রশাসনের অমুক-তমুক ‘কালো তালিকাভুক্ত’ বলে আন্তর্জাতিক মোড়লের ঘোষণা বাজারে ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির উৎসাহিত গলাবাজি বেড়ে যায়। আরো লক্ষ করার বিষয় এই যে, কখনই এই ‘কালো তালিকা’ স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসে না; পনেরোই আগস্ট, তেসরা নভেম্বর বা একুশে আগস্টের দুর্বৃত্তদের বেলায় প্রযোজ্য হয় না। জেল হত্যায় অভিযুক্ত, এমনকি দুর্নীতি, অসাধুতা, মানব পাচারের অভিযোগ পর্যন্ত রয়েছে যার বিরুদ্ধে এবং আইন অমান্যের জন্য যাকে মালয়েশিয়া সরকার গ্রেফতার পর্যন্ত করে, তাকেও রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক গুরুতর অপরাধের ব্যাপারে তিলমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে নাগরিত্ব প্রদানের সময় তথাকথিত উন্নত রাষ্ট্রের এতটুকু দ্বিধা থাকে না। দেখছি তো এসবই। দেখছি রাজনৈতিক মঞ্চের নটদের দৌড়ঝাঁপ, লাগামহীন বাক্যাবলি, আচরণ; দেখে চলেছি অসুস্থ প্রতিযোগিতার দৌরাত্ম্য, চিন্তা এবং প্রজ্ঞার দুর্ভিক্ষ, মূল্যবোধের বিপন্নতা। এক একটি প্রতিষ্ঠান কখনো বাইরের হামলায় আবার কখনো ভেতরের ঘুণপোকার আক্রমণে কীভাবে জরাজীর্ণ হয়ে চলেছে—সেটাও দেখতে হচ্ছে। এরই মধ্যে আর একটি ঘটনা ঘটে গেল, ঘটনাটা দুদককেন্দ্রিক। হঠাত্ করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এলো একটা নাম-শরীফ উদ্দিন, উপসহকারী পরিচালক দুর্নীতি দমন কমিশন। তার চাকুরিচু্যতি ঘটেছে গত ১৬ ফেব্র‚য়ারি এক প্রজ্ঞাপনে। আর তারপরই তিনি রীতিমতো যুদ্ধংদেহি মনোভাব প্রদর্শন করেছেন নিজের সদ্য সাবেক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে বিদেশি গণমাধ্যম বিবিসি থেকে শুরু করে দেশের বেশ কয়েকটা প্রথম সারির গণমাধ্যম পর্যন্ত বিশাল বিশাল প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই শরীফ উদ্দিনকে হিরো বানিয়ে দিয়েছে। তিনি এমন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন যে প্রতিষ্ঠানের কাজই হলো দুর্নীতি দমন করা। শুধু বাইরের লোকেরই নয়, তাদের ভেতরের লোকদের দুর্নীতিও এই কর্মপরিধির মধ্যে পড়ে। যারা এই শরীফ উদ্দিনকে নিয়ে এত বিশাল শোরগোল চালাল তাদের কি একবারও মনে হলো না—এই শরীফ উদ্দিন কতখানি শরীফ? কী তার পেছনের খুঁটির জোর, কারা তার সংবাদসূত্র? সেই সংবাদ সূত্রের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কোনো রকম স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কাহিনি, কার কার স্বার্থ উদ্ধার করার জন্য শরীফ উদ্দিনের এই আকস্মিক বিপ্লবী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া—এসবের কি এতটুকু পর্যন্ত যাচাই করার দরকার হলো না? দুদকের একজন মধ্যমমানের কর্মকর্তা তার চাকরিচু্যতির প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরপরই মিডিয়ায় বলে বসলেন যে, তাকে গুম করা হতে পারে আর তাই তিনি আত্মগোপন করে আছেন—এটা কতখানি মেনে নিতে হবে এই প্রশ্নও তো উঠতেই পারে। এখানে একটি বিষয় অবশ্যই মানতে হবে যে শরীফ উদ্দিন যাদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা প্রকাশ করেছেন, তারা কারা? কী তাদের রাজনৈতিক পরিচয়? তাদের অপরাধই-বা কতটুকু? এখানে একটা বিষয় ভাবা দরকার যে, এই হঠাত্ করে সাহসী হয়ে ওঠা মহলের মধ্যে কোনো দুরভিসন্ধি আছে কিনা। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিকভাবে গড়ে তোলার বিরুদ্ধে, পদ্মা সেতুর বিরুদ্ধে যে ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তেমনি মেগা ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত আছে কি না—সেটাও কিন্তু খুঁজে বের করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার পেছনে কে কতখানি সক্রিয়, সেটাও ভালো করে খুঁজে দেখতে হবে। দেখতে হবে দুদকের ক্ষতিতে কার কত লাভ? দুর্নীতি দমন কমিশনের ভাবমূর্তি রক্ষার কাজ দুর্নীতি দমন কমিশনেরই। এই কমিশন যদি ভালো কিছু করতে পারে তাহলে তার সুফল ভোগ করবে দেশ এবং জাতি, আর যদি ব্যর্থ হয় তবে ভুগতে হবে বহুলাংশেই ঐ প্রতিষ্ঠানটিকেই। মিডিয়া যে বিষকুম্ভের বন্ধ মুখ খুলে দিয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সেই মুখটি বন্ধ করার এবং বিষ নিষ্কাশনের দায়িত্বটি তো মিডিয়াকেই নিতে হবে। কথা শুরু হয়েছিল ভিন্ন প্রসঙ্গে। এখানে এই কথাটিও মনে রাখা দরকার যে, বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার মতো ওত পেতে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বই কমছে না। আর তারা আছে ‘ভেতরে-বাহিরে-অন্তরে-অন্তরে’। উই পোকার ঢিবির ভেতরে ঘর বাঁধা এসব কীট ক্রমাগত উদরসাত্ করে চলেছে বাঙালির সংগ্রামের অর্জন, স্বাধিকারের অর্জন, স্বাধীনতার অর্জন। আর মুখোশের আড়ালে মুখগুলো এমনভাবে সেঁটে গেছে, সে সবই হয়ে যাচ্ছে স্থায়ী। মনে পড়ছে একটা বিদেশি চলচ্চিত্রের কথা। কোনো একটা হেলোইনের অনুষ্ঠানে এক পরিবারের সবাই নানা প্রাণীর মুখোশ পরে একটি আলো-আঁধারির মঞ্চে সমবেত হয়েছিল তাদের সদ্যপ্রয়াত পিতার বিশাল সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা করার জন্য। মুখোশগুলো ছিল-শৃগাল, হায়েনা, ব্যাঘ্র, শূকর এবং বিষধর সর্পের। পান-ভোজনের পর যখন সবাই ভাগবাঁটোয়ারার জন্য টেবিলে এসে বসল তখন তাদের মনে হলো এবার মুখোশগুলো খুলে ফেলা দরকার। কিন্তু সবাই প্রাণপণে মুখোশ অপসারণের চেষ্টা করে ব্যর্থ এবং ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। সে সময় আলো-আঁধারির মধ্যে এক ছায়ামূর্তির আবির্ভাব ঘটল। এই ছায়ামূর্তি আর কেউ-ই নয়; তাদের প্রয়াত পিতার আত্মা। তার অট্টহাস্য বুঝিয়ে দিল—চরিত্র অনুযায়ীই যে যে মুখোশ মুখে বসিয়েছিল, প্রত্যেকের মুখোশ স্থায়ী হয়ে গেছে। আর তা খুলবে না আমৃত্যু। আজ মনে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের এই ৫০ বছর পর যদি আমাদের দেশ ও জাতির অর্জনের হিসাব-নিকাশের জন্য এরকম কোনো আয়োজন করা হয়, তখন সবার মুখোশ কি স্থায়ীভাবে সেঁটে বসবে ঐ সিনেমার গল্পের মতো? আমার একান্ত আশা থাকবে, জাতির জনকের কন্যার উদ্যোগে এই ধরনের একটি হেলোইন অনুষ্ঠানের আয়োজনই করা হোক!

জনপ্রিয় সংবাদ

তরুণ প্রজন্ম গঠনে ক্রীড়ার বিকল্প নেই: তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী

কুনাট্য মঞ্চে রাজনীতির রঙ্গশালা

সপ্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৫২:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২২

বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন ঘিরে আবার নতুন ষড়যন্ত্র ক্রমশ দানা বেঁধে উঠছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিশেষ অংশ লক্ষণীয়ভাবে তৎপর। তথাকথিত তৃতীয় শক্তিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার বিপজ্জনক চক্রান্ত চলছে বলে পর্যবেক্ষক মহলের অনেকের ধারণা।

দেশে যখনই নির্বাচনের একটা আবহ সৃষ্টি হয়, তখনই এই অশুভ মহল গর্ত থেকে মুখ বাড়ায়। সব সময়ের মতো আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত এই মহলটি ইতিমধ্যেই তাদের যোগাযোগের মাত্রা বাড়িয়েছে এবং মুখ হিসেবে ড. রেজা কিবরিয়ার মতো কাউকে কাউকে ব্যবহার করছে। এই সব মুখের সংখ্যা কিন্তু সঙ্গোপনে বাড়ছে। কোনো কোনো মুখস্থ মুখ আছে, সতত নিন্দাভাষণে মুখর কণ্ঠ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। মিডিয়ার কোনো কোনো অংশ এদের পর্দায় হাজির করিয়ে কিছু কটুবাক্য উচ্চারণের সুযোগ করে দেয়। আবার কেউ কেউ নিজের কথাটি অন্যের মুখে বসিয়ে নিরীহচিত্তে প্রতিক্রিয়া অবলোকন করতে থাকে। অবশ্য কথা বলার অধিকার তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বীকৃত অধিকার এবং সেটা সংবিধানেরও স্বতঃসিদ্ধ সত্য। তবে এই প্রসঙ্গে একটি মহাজন বাক্য স্মরণে রাখাও প্রয়োজন—তোমার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সীমানা যেন আমার কেশাগ্র স্পর্শ না করে। কিন্তু কোনো কোনো সময় দেখা যায় যে, এই লক্ষ্মণরেখাটিও লঙ্ঘিত হয়ে যাচ্ছে। ইদানীং আর একটি বিষয় খুব নীরবে মাথা তুলছে। তা হলো, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সুনির্দিষ্ট বিদেশি কূটনৈতিক মহলের তৎপরতা। কিন্তু এবার তাদের তৎপরতা শুধু নির্বাচন পরিমণ্ডলের মধ্যেই সীমিত ছিল না; যারা এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ নিয়ে বিশেষ উদ্দেশ্য ফলপ্রসূ করার আয়োজন করেছিল তাদের প্রতিও ঐ মহলের সস্নেহ দৃষ্টিপাতও কিন্তু পরিলক্ষিত হচ্ছিল। এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে বেশ কিছু অন্তর্ঘাতমূলক চক্রান্ত তো ছিলই—বিশেষ করে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে বিপুল অর্থের প্লাবন, অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীকে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ দিয়ে নৌকা প্রতীক সম্পর্কে ভুল ধারণা জনমনে ছড়িয়ে দেওয়া। এসব ঘটনা দলের ভেতরে ঢুকে পড়া এবং প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে দলের সাংগঠনিক স্তরে অনুপ্রবেশকারীর ষড়যন্ত্রেরই ফসল। আর এটাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু সরকারবিরোধী প্রতিষ্ঠান, নামসর্বস্ব সাইনবোর্ডকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংগঠনকে বাছাই করে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছে বেশ কিছু কূটনৈতিক মিশন এবং এই যোগাযোগকে চিত্রিত করছে ‘রুটিন ওয়ার্ক’ হিসেবে। চা-চক্র, গোপন লেনদেন, অপ্রচারিত কার্যক্রম, তথ্য চালাচালি সবই এই তথাকথিত ‘রুটিন ওয়ার্ক’-এর অন্তভু‌র্ক্ত হয়ে যায়। আর এই সূত্র ধরেই জন্ম হয়েছে আন্তর্জাতিক ফরমান। সরকারের কিংবা প্রশাসনের অমুক-তমুক ‘কালো তালিকাভুক্ত’ বলে আন্তর্জাতিক মোড়লের ঘোষণা বাজারে ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির উৎসাহিত গলাবাজি বেড়ে যায়। আরো লক্ষ করার বিষয় এই যে, কখনই এই ‘কালো তালিকা’ স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসে না; পনেরোই আগস্ট, তেসরা নভেম্বর বা একুশে আগস্টের দুর্বৃত্তদের বেলায় প্রযোজ্য হয় না। জেল হত্যায় অভিযুক্ত, এমনকি দুর্নীতি, অসাধুতা, মানব পাচারের অভিযোগ পর্যন্ত রয়েছে যার বিরুদ্ধে এবং আইন অমান্যের জন্য যাকে মালয়েশিয়া সরকার গ্রেফতার পর্যন্ত করে, তাকেও রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক গুরুতর অপরাধের ব্যাপারে তিলমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে নাগরিত্ব প্রদানের সময় তথাকথিত উন্নত রাষ্ট্রের এতটুকু দ্বিধা থাকে না। দেখছি তো এসবই। দেখছি রাজনৈতিক মঞ্চের নটদের দৌড়ঝাঁপ, লাগামহীন বাক্যাবলি, আচরণ; দেখে চলেছি অসুস্থ প্রতিযোগিতার দৌরাত্ম্য, চিন্তা এবং প্রজ্ঞার দুর্ভিক্ষ, মূল্যবোধের বিপন্নতা। এক একটি প্রতিষ্ঠান কখনো বাইরের হামলায় আবার কখনো ভেতরের ঘুণপোকার আক্রমণে কীভাবে জরাজীর্ণ হয়ে চলেছে—সেটাও দেখতে হচ্ছে। এরই মধ্যে আর একটি ঘটনা ঘটে গেল, ঘটনাটা দুদককেন্দ্রিক। হঠাত্ করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এলো একটা নাম-শরীফ উদ্দিন, উপসহকারী পরিচালক দুর্নীতি দমন কমিশন। তার চাকুরিচু্যতি ঘটেছে গত ১৬ ফেব্র‚য়ারি এক প্রজ্ঞাপনে। আর তারপরই তিনি রীতিমতো যুদ্ধংদেহি মনোভাব প্রদর্শন করেছেন নিজের সদ্য সাবেক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে বিদেশি গণমাধ্যম বিবিসি থেকে শুরু করে দেশের বেশ কয়েকটা প্রথম সারির গণমাধ্যম পর্যন্ত বিশাল বিশাল প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই শরীফ উদ্দিনকে হিরো বানিয়ে দিয়েছে। তিনি এমন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন যে প্রতিষ্ঠানের কাজই হলো দুর্নীতি দমন করা। শুধু বাইরের লোকেরই নয়, তাদের ভেতরের লোকদের দুর্নীতিও এই কর্মপরিধির মধ্যে পড়ে। যারা এই শরীফ উদ্দিনকে নিয়ে এত বিশাল শোরগোল চালাল তাদের কি একবারও মনে হলো না—এই শরীফ উদ্দিন কতখানি শরীফ? কী তার পেছনের খুঁটির জোর, কারা তার সংবাদসূত্র? সেই সংবাদ সূত্রের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কোনো রকম স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কাহিনি, কার কার স্বার্থ উদ্ধার করার জন্য শরীফ উদ্দিনের এই আকস্মিক বিপ্লবী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া—এসবের কি এতটুকু পর্যন্ত যাচাই করার দরকার হলো না? দুদকের একজন মধ্যমমানের কর্মকর্তা তার চাকরিচু্যতির প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরপরই মিডিয়ায় বলে বসলেন যে, তাকে গুম করা হতে পারে আর তাই তিনি আত্মগোপন করে আছেন—এটা কতখানি মেনে নিতে হবে এই প্রশ্নও তো উঠতেই পারে। এখানে একটি বিষয় অবশ্যই মানতে হবে যে শরীফ উদ্দিন যাদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা প্রকাশ করেছেন, তারা কারা? কী তাদের রাজনৈতিক পরিচয়? তাদের অপরাধই-বা কতটুকু? এখানে একটা বিষয় ভাবা দরকার যে, এই হঠাত্ করে সাহসী হয়ে ওঠা মহলের মধ্যে কোনো দুরভিসন্ধি আছে কিনা। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিকভাবে গড়ে তোলার বিরুদ্ধে, পদ্মা সেতুর বিরুদ্ধে যে ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তেমনি মেগা ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত আছে কি না—সেটাও কিন্তু খুঁজে বের করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার পেছনে কে কতখানি সক্রিয়, সেটাও ভালো করে খুঁজে দেখতে হবে। দেখতে হবে দুদকের ক্ষতিতে কার কত লাভ? দুর্নীতি দমন কমিশনের ভাবমূর্তি রক্ষার কাজ দুর্নীতি দমন কমিশনেরই। এই কমিশন যদি ভালো কিছু করতে পারে তাহলে তার সুফল ভোগ করবে দেশ এবং জাতি, আর যদি ব্যর্থ হয় তবে ভুগতে হবে বহুলাংশেই ঐ প্রতিষ্ঠানটিকেই। মিডিয়া যে বিষকুম্ভের বন্ধ মুখ খুলে দিয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সেই মুখটি বন্ধ করার এবং বিষ নিষ্কাশনের দায়িত্বটি তো মিডিয়াকেই নিতে হবে। কথা শুরু হয়েছিল ভিন্ন প্রসঙ্গে। এখানে এই কথাটিও মনে রাখা দরকার যে, বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার মতো ওত পেতে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বই কমছে না। আর তারা আছে ‘ভেতরে-বাহিরে-অন্তরে-অন্তরে’। উই পোকার ঢিবির ভেতরে ঘর বাঁধা এসব কীট ক্রমাগত উদরসাত্ করে চলেছে বাঙালির সংগ্রামের অর্জন, স্বাধিকারের অর্জন, স্বাধীনতার অর্জন। আর মুখোশের আড়ালে মুখগুলো এমনভাবে সেঁটে গেছে, সে সবই হয়ে যাচ্ছে স্থায়ী। মনে পড়ছে একটা বিদেশি চলচ্চিত্রের কথা। কোনো একটা হেলোইনের অনুষ্ঠানে এক পরিবারের সবাই নানা প্রাণীর মুখোশ পরে একটি আলো-আঁধারির মঞ্চে সমবেত হয়েছিল তাদের সদ্যপ্রয়াত পিতার বিশাল সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা করার জন্য। মুখোশগুলো ছিল-শৃগাল, হায়েনা, ব্যাঘ্র, শূকর এবং বিষধর সর্পের। পান-ভোজনের পর যখন সবাই ভাগবাঁটোয়ারার জন্য টেবিলে এসে বসল তখন তাদের মনে হলো এবার মুখোশগুলো খুলে ফেলা দরকার। কিন্তু সবাই প্রাণপণে মুখোশ অপসারণের চেষ্টা করে ব্যর্থ এবং ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। সে সময় আলো-আঁধারির মধ্যে এক ছায়ামূর্তির আবির্ভাব ঘটল। এই ছায়ামূর্তি আর কেউ-ই নয়; তাদের প্রয়াত পিতার আত্মা। তার অট্টহাস্য বুঝিয়ে দিল—চরিত্র অনুযায়ীই যে যে মুখোশ মুখে বসিয়েছিল, প্রত্যেকের মুখোশ স্থায়ী হয়ে গেছে। আর তা খুলবে না আমৃত্যু। আজ মনে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের এই ৫০ বছর পর যদি আমাদের দেশ ও জাতির অর্জনের হিসাব-নিকাশের জন্য এরকম কোনো আয়োজন করা হয়, তখন সবার মুখোশ কি স্থায়ীভাবে সেঁটে বসবে ঐ সিনেমার গল্পের মতো? আমার একান্ত আশা থাকবে, জাতির জনকের কন্যার উদ্যোগে এই ধরনের একটি হেলোইন অনুষ্ঠানের আয়োজনই করা হোক!