
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিপাকে সাধারণ মানুষ। পরিবারের চাহিদা মেটাতে হিমশিম অবস্থা অনেকের। অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে পণ্য কিনতে মানুষের লম্বা লাইন। ভিড় ঠেলে কাঙ্ক্ষিত পণ্য নিয়ে বাড়ি ফিরছেন এক নারী।
গতকাল রাজধানীর হাইকোর্টসংলগ্ন এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিপাকে সাধারণ মানুষ। পরিবারের চাহিদা মেটাতে হিমশিম অবস্থা অনেকের। অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে পণ্য কিনতে মানুষের লম্বা লাইন। ভিড় ঠেলে কাঙ্ক্ষিত পণ্য নিয়ে বাড়ি ফিরছেন এক নারী। গতকাল রাজধানীর হাইকোর্টসংলগ্ন এলাকায়ছবি: সাজিদ হোসেন সরকারের হাতে চাল ও গমের মজুত এখন সর্বোচ্চ। পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ টন। সর্বশেষ দুই মৌসুমে ধান আবাদ বড় কোনো দুর্যোগে পড়েনি, বরং উৎপাদন বেড়েছে। সরকার আমদানির সুযোগ দিয়েছে। বিশ্ববাজারেও দাম কম। তারপরও দেশে চালের দাম কমছে না। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) বাজারদরের তালিকা অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে মোটা চালের গড় দাম ছিল কেজি ৪০ টাকারও কিছু কম। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৪৮ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০২১ সাল জুড়েই দাম চড়া ছিল। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, বাজারে এখন মোটা চালের কেজি ৪৪-৫০ টাকা। অবশ্য বাজার ঘুরে দেখা যায়, মোটামুটি ভালো মানের মোটা চাল কিনতে ৪৮-৫০ টাকা লাগছে। মধ্যম আয়ের পরিবারে জনপ্রিয় মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল। এই চাল কিনতে কেজিতে ব্যয় করতে হচ্ছে ৬৪ থেকে ৭২ টাকা। মাঝারি বিআর-২৮ ও সমজাতীয় চাল কেনা যাচ্ছে মানভেদে কেজি ৫২ থেকে ৫৮ টাকায়। চালের দাম নিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ও চিন্তিত। তারা এক সপ্তাহ ধরে বড় চালকল ও চাল ব্যবসায়ীর কাছে মজুতের হিসাব চাইছে। সম্প্রতি খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক সভায় চাল আমদানির হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমদানির নথিপত্র তৈরি আছে। অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কৌশলের সুফল পাওয়া যায়নি। কারণ, সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্ত নেই। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে দেশের আটজন শীর্ষ চাল ব্যবসায়ী এবং চারজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা দাম কমানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য চালের বাজার পরিস্থিতি বুঝে সঠিক পদক্ষেপ না নিতে পারাকে দায়ী করছেন। কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকও স্বীকার করেন, সত্যিকার অর্থে দেশে চালের প্রকৃত উৎপাদন ও ভোগ নিয়ে তথ্যের ঘাটতি আছে। তাঁর মতে, দেশে প্রতিবছর জনসংখ্যা বাড়ছে। চাল ব্যবহারের নতুন নতুন খাত তৈরি হচ্ছে। মন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, দেশের মানুষের আয় বেড়ে যাওয়ায় মাঝারি ও সরু চাল কেনা বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরু চালের উৎপাদন হয়তো বাড়ছে না। এ কারণে বাজার একটু বাড়তি। তবে বোরো ধান উঠলে দাম কমে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ১৭ লাখ টনের অনুমতি, আমদানি ৩ লাখ টন সরকার গত বছরের আগস্টে চাল আমদানির করভার সাড়ে ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করে ১৭ লাখ টন আমদানির অনুমতি দেয়। শর্ত দেওয়া হয় যে নভেম্বরের (গত) মধ্যে ওই চাল দেশে আনতে হবে। তবে অনুমতি নিয়ে মাত্র ৩ লাখ টন চাল আমদানি করেছেন বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা। এর কারণ জানতে চাইলে চাল আমদানিকারক চিত্ত মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, যখন আমদানির অনুমতি দেওয়া দরকার ছিল, তখন দেওয়া হয়নি। যখন আমদানি শুরু হয়, তখন ভারতের সীমান্ত দিয়ে দেশে একটি চালের ট্রাক প্রবেশ করতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সব মিলিয়ে আমদানি সম্ভব হয়নি। মজুত ভালো, উৎপাদনও বেশি: খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত বছরের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি গুদামে চালের মজুত ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার টন, যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। কিন্তু এ বছর চালের মজুত ১৭ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। গম, কিছু ধানসহ মোট খাদ্য মজুত প্রায় ২০ লাখ টন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাবে, গত আমনে দেশে ১ কোটি ৩৮ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। সবকিছু স্বাভাবিক থাকার পরও চালের দাম না কমার কারণ জানতে খাদ্য মন্ত্রণালয় এ মাসে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে চাল ব্যবসায়ীরা মাঝারি ও সরু চালের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়ছে বলে উল্লেখ করেছেন। তবে কিছু কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মজুত করছেন বলেও কেউ কেউ অভিযোগ তোলেন। আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী দাম কমানোর কোনো আশ্বাস না পাওয়ায় আবারও আমদানির অনুমতি দেওয়ার হুমকি দেন। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা দেশের কোথায় কী পরিমাণ চাল মজুত আছে, সে খোঁজখবর নিচ্ছি। আর কী পরিমাণ চাল প্রয়োজন, সেই হিসাব করা হচ্ছে। প্রয়োজনে চাল আমদানির অনুমতির প্রস্তুতিও নিচ্ছি।’ ইউএসডিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশকে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে চলতি অর্থবছরে ১৫ লাখ টন চাল আমদানি করতে হবে। অবশ্য ব্যবসায়ীরা এর পক্ষে নন। নওগাঁ ধান্য-চাল আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরদ বরণ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য চাল আমদানির যে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে, তা সঠিক নয়। কারণ, দেশে কোথায় কী পরিমাণে চাল আছে, তার কোনো হিসাব সরকারের কাছে নেই। তিনি বলেন, ‘খাদ্য অধিদপ্তর থেকে দেশে চালের দাম বেড়ে গেলে আমাদের কাছে চালের মজুতের হিসাব চায়। বাকি সময় তারা এ ব্যাপারে চুপ থাকে। আর চাল ও ধান ব্যবসায়ীরা যে হিসাব কাগজে-কলমে দেন, তা পরীক্ষা করে দেখারও সুযোগ সরকারি লোকজনের নেই। ফলে প্রকৃত বাজার ও বেসরকারি মজুত পরিস্থিতি সরকার জানতে পারে না।’ কেন দাম বাড়ছে: ইউএসডিএ চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশের চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এবং খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, চলতি বছর বাংলাদেশে ৩ কোটি ৫৯ লাখ টন চাল উৎপাদিত হবে, যা এর আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। ইউএসডিএ চালের দাম বেশি থাকার কারণ হিসেবে তিনটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছে। প্রথমত, জ্বালানি তেলের দাম গত বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে সেচের খরচ ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশে মূল্যস্ফীতিও অনেকটাই বেড়েছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের চালের বাজারে সম্প্রতি কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী বিনিয়োগ করেছে। তারা বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ চাল কিনে ব্যবসার জন্য মজুত করেছে। ফলে বাজারে চালের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সার্বিকভাবে চালের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সাবেক কৃষিসচিব এ এম এম শওকত আলী বলেন, বাজারে চালের সরবরাহ বাড়াতে হবে। সরকারের কাছে চাল উৎপাদন ও মজুতের সঠিক তথ্য নেই এমন কথা বললে চলবে না। তিনি বলেন, চালের আন্তর্জাতিক বাজার ও অভ্যন্তরীণ বাজার নজরদারি ও পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা খাদ্য অধিদপ্তরের নেই। এটা গড়ে তুলে হবে।
অনলাইন ডেস্ক 




















