নিজস্ব প্রতিবেদক
শুধু সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা ধর্মীয় আবেগের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুববিষয়ক সহ-সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক তৎপরতা ও তরুণদের মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত সক্ষমতা প্রমাণিত হয় তাদের নীতি, পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মীর নেওয়াজ বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। তবে কোনো দল কতটা সক্রিয়, সেটিই মুখ্য নয়; বরং সেই সক্রিয়তার মাধ্যমে জনগণের জন্য কী করা হচ্ছে এবং গণতন্ত্রের প্রতি কতটা দায়বদ্ধতা দেখানো হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক এবং দলটির অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অতীতের ভূমিকা, বর্তমান বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি—সবকিছুরই জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিভিন্ন সময়ে দলটির অবস্থান ও রাজনৈতিক মিত্র পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে জামায়াতের ভূমিকা, ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের আমলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনীতি—এসব বিষয় রাজনৈতিক মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে ভবিষ্যতে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কোনো রাজনৈতিক জোট বা সমঝোতা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার পক্ষে নন মীর নেওয়াজ। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনগণের প্রত্যাশা এবং দলের নীতিগত অবস্থান বিবেচনা করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জামায়াত তরুণদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে কি না—এমন প্রশ্নে মীর নেওয়াজের অভিযোগ, দলটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আবেগ ও নামকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে দেশের উন্নয়ন, বৈষম্যহীনতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগানো উচিত।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। তরুণদের আবেগকে রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করা আর তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা এক বিষয় নয়।
ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামী এক বিষয় নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলাম একটি ধর্ম, আর জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল। কোনো রাজনৈতিক দলেরই নিজেকে ইসলামের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয় বলে মত দেন তিনি।
তাঁর মতে, নির্বাচনী সাফল্যকে কোনো ধর্মের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন না করে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের নীতি, সততা, কর্মসূচি ও জবাবদিহির মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করা।
জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে বিএনপির আপত্তির জায়গা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও জনগণের ম্যান্ডেটের প্রশ্নে দুই দলের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। বিএনপি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারকে গুরুত্ব দেয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জামায়াতের উত্থান বিএনপির ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলতে পারে কি না—এমন প্রশ্নে মীর নেওয়াজ বলেন, বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি দেশের জনগণ। অন্য কোনো দলের রাজনৈতিক অবস্থান বা সাফল্যকে কেন্দ্র করে বিএনপি নিজেদের রাজনীতি পরিচালনা করে না বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলায় জনগণের আস্থা অর্জন, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি জোরদার করা এবং কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও জননিরাপত্তার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠপর্যায়ে কাজ করার সক্ষমতাকে দলটির শক্তির জায়গা হিসেবে উল্লেখ করলেও রাজনৈতিক ইতিহাস, আদর্শ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় শক্তি হয়ে উঠতে হলে জামায়াতকে অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান, নারীর অধিকার, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে বলেও মনে করেন মীর নেওয়াজ।
সাধারণ ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো দলের স্লোগান, আবেগ কিংবা বাহ্যিক ভাবমূর্তি দেখে নয়; বরং রাজনৈতিক ইতিহাস, নীতি, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনা যাচাই করেই ভোটারদের মত গঠন করা প্রয়োজন।