বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা (২০২৬–২০৫০) প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে উপস্থাপন করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হিসেবে দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা তুলে ধরা হয়।
সভায় আগের তিনটি মহাপরিকল্পনার নীতিগত ঘাটতি (পলিসি গ্যাপ) চিহ্নিত করে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা হয়। নতুন মহাপরিকল্পনা তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে—
প্রথম ধাপ: ২০২৬–২০৩০,
দ্বিতীয় ধাপ: ২০৩০–২০৪০ এবং
তৃতীয় ধাপ: ২০৪০–২০৫০ সাল।
প্রথম ধাপের ‘ফার্স্ট ট্র্যাক প্রায়োরিটি প্রজেক্ট’-এর আওতায় অফশোর অনুসন্ধান রাউন্ড, গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি সরবরাহ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, রিফাইনারি সক্ষমতা এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—অফশোর গ্যাস উন্নয়ন, বৃহৎ পরিসরে রিফাইনিং ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সম্প্রসারণ, হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়া অবকাঠামো উন্নয়ন, ভূ-তাপীয় (জিওথার্মাল) শক্তি এবং জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্র তরঙ্গভিত্তিক নবায়নযোগ্য শক্তি উন্নয়ন।
সভায় প্রধান উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন,
“বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ এই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত। এ খাত শক্তিশালী হলে দেশের অর্থনীতি দাঁড়াবে। দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন এই খাত দ্বারা প্রভাবিত।”
তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক গবেষণার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠনের নির্দেশ দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য একটি আলাদা ইনস্টিটিউশন প্রয়োজন। এটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে হলে চলবে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এই প্রতিষ্ঠান নীতিনির্ধারণে সরকারকে সহায়তা করবে।”
অতীতের পরিকল্পনাগুলোকে ‘খাপছাড়া’ আখ্যায়িত করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভবিষ্যতে যেন ভুল লোকেশন বা ভুল কাঠামোয় প্রকল্প না হয়, সেজন্য সুস্পষ্ট কাঠামো ও নিয়মের মধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিকল্প জ্বালানি উৎস নিয়েও আরও গভীর গবেষণার নির্দেশ দেন তিনি।
মন্ত্রণালয় জানায়, মহাপরিকল্পনায় জ্বালানি খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করে জলবায়ু প্রভাব কমানোর কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যুৎ চাহিদা ২০৫০ সালের মধ্যে ১৭ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ৫৯ গিগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে উন্নত ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ ০.৬২ থেকে কমে ০.৩৫ টন CO₂/মেগাওয়াট-ঘণ্টায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু উদ্যোগের মাধ্যমে বার্ষিক ৬৪.৫ মিলিয়ন টন এবং মোট ১,৬০০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস সম্ভব হবে।
মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫, রিনিউএবল এনার্জি পলিসি ২০২৫, রুফটপ সোলার প্রোগ্রাম ২০২৫ এবং নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ গ্রহণ করা হয়েছে।
মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬–২০৫০ মেয়াদে জ্বালানি খাতে ৭০–৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বিদ্যুৎ খাতে ১০৭.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
অনলাইন ডেস্ক 




















