রাজধানী ঢাকায় একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর শুধু ভবনধসই নয়, গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট এবং পানির সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে গ্যাস লিকেজ ও বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে পানির পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে, ফলে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সাবেক সহসভাপতি এবং সেন্টার ফর হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাদেক বলেন, ভূমিকম্পপ্রবণ শহরগুলোতে অগ্নিকাণ্ড অন্যতম বড় গৌণ দুর্যোগ। তার ভাষ্য, গ্যাস পাইপলাইন ফেটে যাওয়া, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট এবং রান্নার সময় গ্যাসের চুলা থেকে আগুন লাগার ঘটনা বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
তিনি জানান, ১৯০৬ সালের সান ফ্রান্সিসকো ভূমিকম্পে মোট ক্ষয়ক্ষতির প্রায় ৮০ শতাংশই অগ্নিকাণ্ডের কারণে হয়েছিল। ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের মতো শহরে বিস্তৃত গ্যাস পাইপলাইন থাকায় এসব এলাকার ঝুঁকি আরও বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞরা ভবনের মূল বিদ্যুৎ সংযোগে স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ ব্যবস্থা স্থাপন, গ্যাস ও পানির লাইনে কম্পন-সংবেদনশীল নিরাপত্তা প্রযুক্তি এবং পাইপলাইনে নমনীয় (ফ্লেক্সিবল) জয়েন্ট ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাদের মতে, ভূমিকম্পের প্রাথমিক কম্পন শনাক্ত করেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা গেলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ২০১৫ সালের পর স্বয়ংক্রিয় ইমার্জেন্সি শাটডাউন সিস্টেম চালুর একটি প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের পর প্রথম ১৫ সেকেন্ডের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা গেলে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
অন্যদিকে, তিতাস গ্যাসের অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জানান, বর্তমানে মূল গ্যাস নেটওয়ার্কে স্বয়ংক্রিয় শাটডাউন বা দূরনিয়ন্ত্রিত (এসসিএডিএ) ব্যবস্থা নেই। তবে ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যদিও এর জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থায়নের প্রয়োজন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ন, ঘনবসতি, দুর্বল অবকাঠামো এবং পুরোনো গ্যাস ও বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের কারণে ঢাকার ভূমিকম্প-পরবর্তী ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। তাই সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় এড়াতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।