ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে দিল্লির আগ্রহ, আলোচনায় প্রত্যর্পণ ইস্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউন-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ঢাকায় ফেরত না পাঠালে তারেক রহমান ভারত সফর করবেন না এবং ব্রিকস সম্মেলনেও অংশ নেবেন না।
প্রতিবেদনটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, গত ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। বৈঠকে বাংলাদেশ ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্ত করে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছে, ১০ আগস্টের বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতা শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের ফেরত দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদারের জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তবে দ্য ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ না হলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করবে ঢাকা। এমনকি ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও একই ইস্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দিল্লিকে জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রিত—এমন তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে বাংলাদেশকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়ে থাকতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এদিকে ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র)-এর প্রধান পরাগ জৈনও সফর করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এ কে এম শামসুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে।
পরাগ জৈনের সফরকে দুই দেশের নিরাপত্তা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বৈঠকে ঠিক কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
অন্যদিকে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী করার বিষয়ে ভারতের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। ভারতীয় পক্ষও দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
১০ আগস্টের বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ প্রতিষ্ঠিত আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার ভারত থেকে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ৫ আগস্ট ভারতের মাটি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যের পর বাংলাদেশ এ বিষয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। এর পরই প্রত্যর্পণ ইস্যুটি দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে একই সময়ে দুই দেশই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক ও কার্যকর রাখার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক স্বার্থ—সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের অবস্থানের কতটা সমন্বয় হয়, তার ওপর আগামী দিনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে।
তবে দ্য ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদনে তারেক রহমানের ভারত সফর ও ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে সরাসরি শর্তযুক্ত করার যে দাবি করা হয়েছে, সেটি এখনো বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশ্য আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে নিশ্চিত নয়। ফলে বিষয়টি আপাতত কূটনৈতিক সূত্রভিত্তিক দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।