উজানে ভারত ও চীনের বিভিন্ন নদীতে নির্মিত বাঁধ ও জলাধার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য বড় ধরনের বন্যা ও জলপ্রবাহজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক বিডিআর মহাপরিচালক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান।
নেপালে সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের ভয়াবহতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি কিংবা কোনো কারণে উজানের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিপুল পরিমাণ পানি দ্রুত নিম্নাঞ্চলের দিকে নেমে আসতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফজলুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উজানে থাকা আন্তর্জাতিক নদীগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাঁধ ও জলাধার রয়েছে। এসব জলাধারে বিপুল পরিমাণ পানি ধরে রাখা হয়। কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাঁধ ধসে পড়ার মতো ঘটনা ঘটলে সেই পানি আকস্মিকভাবে নেমে এসে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ও নদী অববাহিকা এলাকায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বিশেষভাবে তিস্তা নদী অববাহিকার ঝুঁকির কথা তুলে ধরে বলেন, আকস্মিক অতিরিক্ত পানি প্রবাহের ক্ষেত্রে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামসহ নদীঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, বিপুল পরিমাণ পানির আকস্মিক প্রবাহের অভিঘাত অত্যন্ত শক্তিশালী হতে পারে। তিনি এর ভয়াবহতা বোঝাতে পারমাণবিক বোমার ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে পানির এই সম্ভাব্য অভিঘাত ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিয়ে তাঁর এ ধরনের তুলনা একটি আশঙ্কাভিত্তিক বক্তব্য; এর বৈজ্ঞানিক মাত্রা নির্ধারণের জন্য জলপ্রবাহ, বাঁধের অবস্থান, জলাধারের ধারণক্ষমতা, ভূপ্রকৃতি এবং সম্ভাব্য বন্যার মডেলিংসহ বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সম্ভাব্য এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় এখন থেকেই একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, নদীর পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার, সীমান্তবর্তী এলাকার ঝুঁকি মূল্যায়ন, দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা জরুরি।
একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়টির দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর মতে, সম্ভাব্য পানিজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা ও উজানের বাঁধ থেকে সম্ভাব্য আকস্মিক পানি প্রবাহ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ঝুঁকি হলেও কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কতটা পানি বাংলাদেশে পৌঁছাবে বা কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হবে, তা নির্ভর করবে একাধিক ভৌগোলিক, জলবায়ু ও অবকাঠামোগত বিষয়ের ওপর। তাই আতঙ্কের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক তথ্য, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে প্রস্তুতি নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
ফজলুর রহমানের ভাষায়, সম্ভাব্য বিপর্যয় ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা অনেক বেশি কার্যকর। তাই সময় থাকতে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি ‘মাস্টারপ্ল্যান’ গ্রহণ করতে হবে।