প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী সফরকে ঘিরে যখন প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে, ঠিক তখনই পাশের বাজিতপুর উপজেলায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ বুধবার (১৩ আগস্ট) বিকেলে বাজিতপুর পৌর এলাকার সিনেমা হল মোড়ে মাইজচর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হাকিম মিয়াজির ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীর স্বজন ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হাকিম মিয়াজির ওপর হামলা চালানো হয়েছে এবং তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যেই হামলা করা হয়। তবে হামলার অভিযোগের স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিক সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্বজনদের ভাষ্য, বুধবার বিকেল ৫টার দিকে সিনেমা হল মোড় এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি হাকিম মিয়াজির ওপর হামলা চালান। এ সময় বহিষ্কৃত উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে তাঁদের দাবি। হামলায় পৌর ছাত্রদলের বহিষ্কৃত সভাপতি সাকিন, বাজিতপুর কলেজ ছাত্রদলের নেতা সিমন আহমেদ, ইমরান ও গিয়াস উদ্দিনসহ কয়েকজন জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
হামলার পর হাকিম মিয়াজিকে প্রথমে বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা।
তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। বাজিতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম শহীদুল্লাহ জানান, হামলার একটি ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেননি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজিতপুর বাজার এলাকায় পুলিশ পর্যবেক্ষণে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
হামলার অভিযোগের কয়েক দিন আগে, গত ১০ আগস্ট বিকেলে বাজিতপুরের সরারচর বাজার এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্র ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ধানের শীষের প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদাকে ঘিরে একটি ব্যানার নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের একটি অংশ ব্যানারটি পুড়িয়ে এবং তাতে থাকা ছবিতে জুতা দিয়ে আঘাত করে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মতে, এসব ঘটনার পেছনে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বিরোধ ও পরস্পরের প্রতি ক্ষোভের প্রভাব রয়েছে। এরই মধ্যে ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কটিয়াদী সফরকে সামনে রেখে বাজিতপুর-নিকলীতে বিএনপির বিভিন্ন পক্ষ পৃথক সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচিতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরও প্রকাশ্যে আসছে।
বাজিতপুর-নিকলীর স্থানীয় রাজনীতিতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে কথা বলেছেন দলটির নেতা সৈয়দ এহসানুল হুদা। ১৩ আগস্ট দুপুরে তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা বর্তমানে অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন। বহিষ্কৃত নেতাকর্মীদের চাপের কারণে তাঁরা বিভিন্নভাবে সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
দলের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করতে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন বলেও জানান। তবে হাকিম মিয়াজির ওপর হামলার অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণেও বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের প্রভাব দেখা গেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির প্রার্থী ছিলেন সৈয়দ এহসানুল হুদা।
পরপর কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাজিতপুরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কটিয়াদী সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে পার্শ্ববর্তী উপজেলায় এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে সতর্কতা তৈরি হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি তাদের নজরদারিতে রয়েছে। তবে হামলার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় এখন পর্যন্ত কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ দ্রুত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে নিরসন করা না গেলে ভবিষ্যতে তা আরও বড় সংঘাতের কারণ হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি ও কেন্দ্রীয় নেতার সফরকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সংযম এবং প্রশাসনের সক্রিয় নজরদারি জরুরি।