নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এস আলম গ্রুপ, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগকারী ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসীন আলীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন এই তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। ফলে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিয়েই ব্যাংকের ভেতরে তৈরি হয়েছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জহির হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ইয়াসীন আলীকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি; সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পূর্বানুমতি ছাড়া দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ দায়ের করায় তাঁর বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি মোহাম্মদ আলতাফ হোসেনের বক্তব্য, ইয়াসীন আলীকে বরখাস্ত করার তথ্য সঠিক নয়।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা যায়, গত ২৬ জুলাইয়ের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড, গ্যালাক্সি সোয়েটার ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দায়েরের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
পরদিন, ২৭ জুলাই, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতাও দেওয়া হয় ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসীন আলীকে।
এ অবস্থায় ইয়াসীন আলী নিজ উদ্যোগে অনুমোদনবহির্ভূতভাবে দুদকে অভিযোগ করেছেন—ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এমন দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট নথিতে অভিযোগ দায়েরের অনুমোদন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে এস আলম গ্রুপ, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুল মাওলাসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
ব্যাংকের অভিযোগ অনুযায়ী, সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেডের ঋণসীমা ১০০ কোটি টাকা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। পরে ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, চারটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের পৃথক তদন্তে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সুপ্রভ কম্পোজিটের ঋণসীমা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়।
তবে অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া চলমান।
মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ও ঋণ অনিয়মসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর নামও উঠে এসেছে।
ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে করা অভিযোগে তাঁকেও ৩৮ জনের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দায়ের হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ, পরিচালনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। এরপর ব্যাংকটির নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়।
বর্তমানে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন সময়ে ব্যাংকটিতে সংঘটিত ঋণ অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও পর্যালোচনা চলছে।
এর মধ্যেই ব্যাংকের পক্ষ থেকে দুদকে অভিযোগকারী একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ইয়াসীন আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নে ইসলামী ব্যাংকের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা দিয়েছে।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জহির হোসেন বলছেন, ইয়াসীন আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন।
অন্যদিকে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন বলছেন, বরখাস্তের তথ্য সঠিক নয়।
ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং দুদকে অভিযোগ দায়েরের অনুমোদন ও পরবর্তী শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে কোনো প্রশাসনিক অসঙ্গতি রয়েছে কি না।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ হলে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।