তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের সুদের হার (ইল্ড) বাড়ার কারণে সোমবার ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদ বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ারে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছেন।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের পরও হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতার লক্ষণ দেখা যায়নি। তাত্ত্বিকভাবে সোমবারই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যেই তেলের দাম সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির ধারাবাহিকতায় আরও বেড়েছে।
সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তির পথে ওমান বাধা হয়ে দাঁড়ালে দেশটিতে বোমা হামলা চালানো হতে পারে।
ট্রেড নেশনের বিশ্লেষক ডেভিড মরিসন বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
সোমবার তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে, ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন সরকারি বন্ডের বা ট্রেজারি ইল্ড বেড়ে ৫.৩১ শতাংশে উঠেছে, যা ২০০৭ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড দ্রুত বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো বাজারে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ মার্কিন সরকারি বন্ড বাজারে আসায় দেশটির বাজেট ঘাটতি আরও বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীরা বেশি ইল্ড দাবি করতে পারেন।
ব্রিফিং ডটকমের বিশ্লেষক প্যাট্রিক ও’হেয়ার বলেন, তেলের দাম ও সুদের হার এভাবে একসঙ্গে বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমে যায়।
তিনি বলেন, সোমবারের বাজারে শেয়ার কেনার আগ্রহ খুব বেশি ছিল না। গ্রীষ্মকালীন ছুটির কারণে লেনদেনের পরিমাণ কম থাকায় বাজারে এই পতনের প্রভাব আরও বেশি হয়েছে বলেও তিনি জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রধান শেয়ারবাজার সূচকই দিন শেষে কমেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ০.৫ শতাংশ কমেছে।
এর আগে ইউরোপের লন্ডন, প্যারিস ও ফ্রাঙ্কফুর্টের শেয়ারবাজারও নিম্নমুখী ছিল।
এদিকে, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) এক গবেষণাপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক কোম্পানির শেয়ারে সম্ভাব্য ‘ডটকম বুদ্বুদের’ মতো বড় ধরনের পতনের প্রভাব নিয়ে ইউরোপের বাজারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ইসিবির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতের প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বর্তমান শেয়ারমূল্যের বড় ধরনের সংশোধনের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের এআই কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় পতন হলে তা ইউরোপীয় বাজারের জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
ইসিবি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এমন পতনের প্রভাব শুধু আর্থিক বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ইউরোপের মানুষের অর্থনৈতিক আস্থা, ঋণের পরিস্থিতি এবং নিয়োগের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের এআই খাতে বড় ধস শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা হয়ে থাকবে না।
এখন বিনিয়োগকারীদের নজর রয়েছে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বড় খুচরা বিক্রেতা ওয়ালমার্ট, হোম ডিপো ও টার্গেটের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের দিকে। এসব প্রতিবেদন থেকে মার্কিন ভোক্তাদের ব্যয় করার প্রবণতা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার দুর্বল হওয়া এবং ভোক্তাদের ব্যয় কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এসব বড় খুচরা কোম্পানির ফলাফল প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ হলেও তা শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে জানিয়েছেন সুইসকোটের বিশ্লেষক ইপেক ওজকারদেস্কায়া।
তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরে ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ার ইঙ্গিত মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ কমাতে পারে। এতে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারের প্রত্যাশা কমবে এবং মার্কিন বন্ডের ইল্ডও নিচে নামতে পারে। প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের ওপর নির্ভরশীল প্রধান মার্কিন সূচকগুলোর জন্য এটি ইতিবাচক হতে পারে।
এশিয়ায় হংকংয়ের শেয়ারবাজার প্রযুক্তি জায়ান্ট আলিবাবা, টেনসেন্ট ও জেডি ডটকমের শেয়ারের উত্থানে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। সাংহাই ও তাইপের শেয়ারবাজারও বেড়েছে। ছুটির কারণে সিউলের বাজার বন্ধ ছিল।
জাপানের টোকিও শেয়ারবাজারও বেড়েছে। চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়ার শেয়ার ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এছাড়া সফটব্যাংক, অ্যাডভানটেস্ট ও টোকিও ইলেকট্রনের শেয়ার ১.৬ থেকে ২.৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।