জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল। বাড়তে থাকা তাপমাত্রায় গলছে হিমবাহ, দুর্বল হচ্ছে পাহাড়ের বরফ ও শিলাস্তরের স্থিতিশীলতা। এর ফলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও আকস্মিক পাহাড়ধসের মতো বিপর্যয়ের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর নতুন করে সামনে এসেছে হিমালয়ের এই বিপজ্জনক পরিবর্তন। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ ও শিলাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বরফের সহায়ক শক্তি কমে যাচ্ছে, গলনজল বাড়ছে এবং জমাট বাঁধা ও গলার স্বাভাবিক চক্রেও পরিবর্তন ঘটছে। এতে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে বড় ধরনের ধসের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের তুষারঢাকা পাহাড়গুলো গত ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। একই সময়ে দেশটির হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় পরবর্তী দশকে প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি দ্রুত গলেছে।
হিমবাহ গলনেই শেষ নয়, বাড়ছে ‘ক্যাসকেডিং’ বিপর্যয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমবাহ গলার প্রভাব শুধু পানির সংকট বা নদীর প্রবাহ পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরফ, পাথর, তুষার ও পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা একসঙ্গে কাজ করলে একটি ছোট ঘটনা বড় ধরনের দুর্যোগে রূপ নিতে পারে।
সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যার ঘটনায় হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়া এবং পরবর্তী বরফ-পাথরের ধস বড় ধরনের আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণেও হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থা ICIMOD-এর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার মতো দুর্যোগের ঘনত্ব ও তীব্রতা—দুটিই বাড়ছে। দ্রুত পরিবর্তিত পানি, ভূমি ও বায়ুর পরিবেশ পুরো অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে।
অপরিকল্পিত উন্নয়নেও বাড়ছে বিপদ
গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, ব্যাপক নির্মাণকাজ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও টানেল খননের মতো কর্মকাণ্ড পাহাড়ের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনে আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া পাহাড়ে এ ধরনের নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকলে বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাতের সময় ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের ক্ষয়, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া এবং পাহাড়ের ঢালের অস্থিতিশীলতা—সবগুলো কারণ একসঙ্গে কাজ করে এমন দুর্যোগ তৈরি করতে পারে, যাকে তারা ‘compound event’ বা পরস্পর-সম্পর্কিত বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
হিমালয়ের হিমবাহ শুধু পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশের জন্য নয়, এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের পানির উৎসের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া একদিকে তাৎক্ষণিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে পানির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মাণকাজের কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
হিমালয় তাই শুধু বরফ হারাচ্ছে না—এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পুরো পার্বত্য পরিবেশ। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব নেমে আসছে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে বহু দূরের জনপদেও।