• বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৮ পূর্বাহ্ন

মায়ের টাকা তুলতে ঘুষের শিকার, ১৭ বছরের শাহেদের প্রতিবাদ ‘ঘুষ.সাইট’

ইকবাল খান, স্টাফ রিপোটার, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ / ৩৭ Time View
Update : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া গ্রামের সন্তান শাহেদ শরীফ আহমেদ। বয়স মাত্র ১৭ বছর। বর্তমানে বাবার সঙ্গে ময়মনসিংহ সেনানিবাস এলাকায় বসবাস করা এই এ-লেভেলের শিক্ষার্থী নিজের পরিবারের ভোগান্তি থেকেই ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিনব এক উদ্যোগ নিয়েছে। তৈরি করেছে ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের একটি ওয়েবসাইট।

শাহেদের মা আমিনা খাতুন ছিলেন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে শাহেদের পরিবারকে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে হয়রানি ও ঘুষের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শাহেদ।

তার দাবি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে গিয়ে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার টাকা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হয় পরিবারটি। সব মিলিয়ে ঘুষ দিতে হয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা।

শাহেদের অভিযোগ, এরপর মায়ের কল্যাণ তহবিল ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে নতুন করে ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তার।

শুধু মায়ের প্রাপ্য অর্থ তুলতেই নয়, নিজের পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রেও ১ হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন শাহেদ।

পরিবারের এই অভিজ্ঞতা কিশোর শাহেদের মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করে। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি ঘুষের বিরুদ্ধে মানুষের অভিযোগ জানানোর একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেন। তারই ফল ‘ঘুষ.সাইট’।

ওয়েবসাইটটির মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা পরিচয় গোপন রেখে কোথায়, কীভাবে এবং কত টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছে—সে বিষয়ে অভিযোগ জানানোর সুযোগ পাচ্ছেন। শাহেদের দাবি, ওয়েবসাইট চালুর মাত্র নয় দিনের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে দুর্নীতিবাজদের দাবি করা ঘুষের পরিমাণ প্রায় ৩৩২ কোটি টাকা বলেও ওয়েবসাইটটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

একজন কিশোরের ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগটি অল্প সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মায়ের প্রাপ্য টাকা পেতে হয়রানির অভিজ্ঞতা থেকে শাহেদের এই উদ্যোগ অনেকের কাছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিবাদের নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

তবে ওয়েবসাইটে জমা পড়া অভিযোগ ও ঘুষের অঙ্কের সত্যতা যাচাই করা এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির দায় আরোপ না করে বিষয়গুলো যাচাইয়ের মাধ্যমে সামনে আনা প্রয়োজন।

শাহেদের উদ্যোগের মূল বার্তা অবশ্য স্পষ্ট—ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার মানুষ যেন নীরব না থাকেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা নিরাপদে তুলে ধরার সুযোগ পান।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে একজন শিক্ষার্থীর এমন উদ্যোগ এখন প্রশ্ন তুলছে আরও বড় পরিসরে—ঘুষের সংস্কৃতি বন্ধে প্রযুক্তি, নাগরিক সচেতনতা ও জবাবদিহি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category