ঢাকা প্রতিনিধি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসসহ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন টানানো হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনও তাঁকে স্বাগত জানাতে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এসব কর্মসূচির একটি বড় অংশে বিএনপি এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সক্রিয় রয়েছেন।
কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং দলের সাবেক নেতাদের অংশগ্রহণে এ পর্যন্ত ৩৪টি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর কর্মসূচি, বিভিন্ন স্থানে সমন্বয় এবং বিমানবন্দর ও জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জ্যাকসন হাইটসে অনুষ্ঠিত এক প্রস্তুতিসভায় প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন সভাপতিত্ব করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও নিউইয়র্ক স্টেট বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে ব্যানার প্রদর্শন করেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও পোস্টার ও ব্যানার টানিয়েছেন। এসব প্রচারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশাপাশি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার সকালে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন তিনি।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে দীর্ঘমেয়াদি রোহিঙ্গা সংকট বিশেষ গুরুত্ব পাবে। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আয়োজিত একটি পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানাবেন তিনি।
বাংলাদেশের অবস্থান হলো, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জলবায়ু কর্মসূচি ও ন্যায্য রূপান্তর’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অস্তিত্বগত সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
এসব বৈঠকে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা ও জলবায়ু ন্যায্যতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি। বাংলাদেশ আয়োজিত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য এবং ধাত্রীবিদ্যা বিষয়ক একটি পার্শ্ব-অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে।
এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে তাঁর।
সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মেটা, ওয়াল স্ট্রিট ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, উৎপাদন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ, মানবসম্পদ ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে দেওয়া স্বাগত প্রাতরাশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক জাতিসংঘ কর্মসূচি শুরু হবে। পরে তিনি সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী কার্যক্রমে অংশ নেবেন এবং রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান ও তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আয়োজিত সংবর্ধনায় যোগ দেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বাড়তি কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
তারেক রহমান তাঁর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। এর আগে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে প্রথমবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। পরবর্তী সময়েও খালেদা জিয়া সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন।