নিজস্ব প্রতিবেদক
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম (৭৫) ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে (৬৫) কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় শুনানি শেষে গাজী নজরুলের চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এর আগে দুপুর ২টা ২২ মিনিটে পুলিশের একটি সাদা ব্যক্তিগত গাড়িতে করে গাজী নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রীকে আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। পরে বেলা ৩টা ৬ মিনিটে তাদের পঞ্চম তলার ৮ নম্বর আদালতের এজলাসে হাজির করা হয়। তাদের হাতে হাতকড়া না থাকলেও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরানো ছিল।
আদালতে শুনানির শুরুতে আসামিদের নাম ঘোষণা করা হলে গাজী নজরুল মাথা নিচু করে থাকেন। এ সময় তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে কাঁদতে দেখা যায়। শুনানির অধিকাংশ সময়ই সংসদ সদস্য মাথা নিচু করে ছিলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার আসামিদের সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, মরিয়ম খাতুন যখন গলায় ফাঁস দেন, তখন আসামিরা একই বাসায় ছিলেন। আত্মহত্যার পেছনে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ভূমিকা কিংবা প্ররোচনা ছিল কি না, তা উদ্ঘাটনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
রিমান্ডের বিরোধিতা করে আসামিদের জামিন আবেদন করেন আইনজীবী মাহবুবুর রহমান। তিনি আদালতকে বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম চারবারের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ও তার স্ত্রী বয়োবৃদ্ধ এবং সম্মানিত ব্যক্তি। এ ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, গাজী নজরুল তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে ভালোবাসতেন। অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা ঘটেছে এবং তদন্তে তিনি সহযোগিতা করবেন। ফলে তাদের রিমান্ডে নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
রিমান্ডের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, মামলার বাদীর শ্যালককে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে গাজী নজরুল তার মেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিয়ের পর থেকে নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মিলে মরিয়মকে মানসিক নির্যাতন করতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, মরিয়মের রেখে যাওয়া সুইসাইড নোটে মানসিক নির্যাতনের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে তদন্তে পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
শুনানির একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রাজনৈতিক প্রসঙ্গ তুললে বিচারক তাকে মামলার মূল বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেন।
আদালতের আদেশের পর কাঠগড়া থেকে নামানোর সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন না বলেও দাবি করেন তিনি। মরিয়মের আত্মহত্যার কারণও তার জানা নেই বলে জানান সংসদ সদস্য।
আদালতের কার্যক্রম শেষে বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে গাজী নজরুল ও তার স্ত্রীকে আবারও হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে হাজতখানায় নেওয়া হয়।
রোববার বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ফ্ল্যাটে গাজী নজরুল তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন বলে পুলিশ ও পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন গাজী নজরুল। পরে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ তার শ্যালিকাকে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে যান। ভেতর থেকে বন্ধ থাকা একটি কক্ষের দরজা ভেঙে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় মরিয়মের মরদেহ দেখতে পান তারা।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করে।
পরিবারের অভিযোগ, গত জুন মাসে ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ের পর থেকেই ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয়ে মরিয়মের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন।
এ ঘটনায় রোববার গভীর রাতে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ছাড়াও নজরুলের সাবেক গাড়িচালক এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। ওবায়দুর রহমান বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত হন গাজী নজরুল ইসলাম। এর আগে গত জুলাইয়ে এক তরুণীর সঙ্গে তার একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে আলোচনা তৈরি হয়। তখন গাজী নজরুল দাবি করেছিলেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম।