বিশেষ প্রতিবেদন :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন কুতুবপুর ইউনিয়নের নন্দলালপুর শিল্প এলাকায় সরকারি গ্যাসের ব্যবহার ও বিলিং ব্যবস্থাকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ‘গ্যাস মোস্তফা’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি চক্র বিভিন্ন শিল্পকারখানার গ্যাস মিটারে কারসাজি করে প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় কম হিসাব দেখানোর ব্যবস্থা করছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কারখানার সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে গ্যাসের ব্যবহার কম দেখানো হয়। মিটার কারসাজির কাজে অভিজ্ঞ কারিগর ব্যবহার করা এবং বিভিন্ন কারখানায় নিজস্ব লোক রাখার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, এসব লোককে নিয়মিত মাসিক অর্থ দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নন্দলালপুর শিল্প এলাকায় গ্যাসের ব্যবহার, মিটার রিডিং ও বিলিং নিয়ে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে ‘গ্যাস মোস্তফা’র সম্পৃক্ততার অভিযোগই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—কোন কোন কারখানায় মিটার কারসাজি হয়েছে, কত ঘনমিটার গ্যাসের ব্যবহার কম দেখানো হয়েছে এবং এর ফলে রাষ্ট্রের প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ কত? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের পুরোনো মিটার রিডিং, বিল, পরিদর্শন প্রতিবেদন ও কারখানাগুলোর প্রকৃত উৎপাদন তথ্যের সঙ্গে গ্যাস ব্যবহারের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গ্যাসের অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি ‘গ্যাস মোস্তফা’র সম্পদ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। অনুসন্ধানে স্থানীয়ভাবে তার নামে বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা কয়েকটি স্থাবর সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে নন্দলালপুরে লিনা কেমিকেলের পাশে প্রায় ৫ শতাংশ জমি, প্রাইম টেক্সটাইলের বিপরীতে প্রায় ২৯ শতাংশ জমি, পৃথকভাবে প্রায় ৬ শতাংশ জমির ওপর একটি মার্কেট, নন্দলালপুর পুরান মসজিদসংলগ্ন দুই দাগে প্রায় ১১ ও ৪ শতাংশ জমি, দক্ষিণ মহল্লায় প্রায় ৩ কাঠা জমির ওপর চারতলা ভবন, উত্তর মহল্লায় কাকুলি ডাইংয়ের পেছনে প্রায় ৪ কাঠা জমি এবং মসজিদসংলগ্ন প্রায় ৫ কাঠা জমির তথ্য স্থানীয়রা দিয়েছেন।
এ ছাড়া নন্দলালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে প্রায় ৩০ কাঠা জমির কথাও জানা গেছে। স্থানীয়দের হিসাবে, ওই জমির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ৬ কোটি টাকা।
এলাকাবাসীর দাবি, গত প্রায় তিন বছরে মোস্তফা প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকা মূল্যের জমি কিনেছেন। একই সময়ে তার দৃশ্যমান বৈধ আয়ের উৎস কত ছিল—এ প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
তবে শুধু স্থানীয় বক্তব্যের ভিত্তিতে সম্পদের প্রকৃত মূল্য বা অবৈধ উৎসের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় না। এ জন্য ভূমি অফিসের দলিল ও নামজারি নথি, কর-নথি, ব্যাংক লেনদেন, কোম্পানি ও ব্যবসায়িক মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়কর রিটার্ন যাচাই করা জরুরি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এই ব্যবসা পরিচালনা করা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পরও কথিত কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক যোগাযোগ বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া না গেলে তা যাচাইসাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকারি নথি, গ্যাস কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাস রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। কোনো কারখানায় মিটার কারসাজি করে প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় কম বিল আদায় করা হয়ে থাকলে তা শুধু বিল জালিয়াতির অভিযোগ নয়—রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থার ওপরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
তাই নন্দলালপুর শিল্প এলাকার গ্যাস সংযোগগুলোতে বিশেষ অডিট, মিটার পুনঃপরীক্ষা, পুরোনো রিডিং ও বিলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং সন্দেহভাজন কারখানাগুলোর ব্যবহার-উৎপাদন তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন দ্রুত অভিযোগটি যাচাই করে ‘গ্যাস মোস্তফা’র আয় ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করুক। একই সঙ্গে গ্যাস বিতরণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নন্দলালপুর শিল্প এলাকার মিটার ও বিলিং ব্যবস্থার বিশেষ তদন্ত করা হোক।
তদন্তে যদি গ্যাস মিটার কারসাজি, রাজস্ব ফাঁকি কিংবা অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
একুশে সংবাদের অনুসন্ধানে এখন মূল প্রশ্ন—নন্দলালপুরে গ্যাসের মিটারগুলো কি নিয়মমাফিক চলছে, নাকি দীর্ঘদিন ধরে কোনো সংঘবদ্ধ কারসাজির মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজস্ব কম দেখানো হচ্ছে? সেই উত্তরই বের করতে প্রয়োজন নথিভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত।