আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়তে শুরু করায় সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ঈদযাত্রা আবারও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, দুর্ঘটনার কারণ দীর্ঘদিন ধরেই জানা থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির অভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। ঈদের সময় অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করায় মহাসড়কে চাপ বেড়ে যায় এবং এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
তিনি জানান, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই যানবাহন, ক্লান্ত চালক এবং অনিরাপদ চালনা ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। এজন্য নির্ধারিত ঈদ রুটে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার গতিসীমা নির্ধারণ এবং কঠোরভাবে তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
মহাসড়কে অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধের ওপরও গুরুত্ব দেন এই বিশেষজ্ঞ। বিশেষ করে নসিমন, করিমনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ যান এবং প্রশিক্ষণহীন চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে অধ্যাপক তালুকদার বলেন, বিপুলসংখ্যক তরুণ চালক লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়া দীর্ঘপথে চলাচল করছেন, যা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, ছুটির সময়ে বাণিজ্যিক যানবাহনের চালকদের টানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাতে হয়। এতে ক্লান্তি বাড়ে এবং নিরাপদ চালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই চালকদের বাধ্যতামূলক বিশ্রাম নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন তিনি।
নিরাপদ সড়ক চাই-এর মহাসচিব লিটন আরশাদও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ঈদ মৌসুমে ফিটনেসবিহীন যানবাহন অবাধে চলাচল করে এবং অতিরিক্ত আয়ের আশায় অনেক চালক বিশ্রাম ছাড়াই গাড়ি চালান।
তার তথ্য অনুযায়ী, ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মোট প্রাণহানির ৫১ থেকে ৫৩ শতাংশের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল জড়িত থাকে। এছাড়া ফিডার রোড সরাসরি মহাসড়কে যুক্ত হওয়াসহ অবকাঠামোগত ত্রুটিও দুর্ঘটনার বড় কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু পুলিশের পক্ষে ঈদের অতিরিক্ত যানচাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য সরকারি সংস্থা, এনজিও এবং প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, ঈদযাত্রায় যানজট কমাতে ও ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে ঢাকাজুড়ে ৬৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি মহাসড়কে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, গোয়েন্দা সদস্য ও হাইওয়ে পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
সরকার পোশাক কারখানার শ্রমিকদের পর্যায়ক্রমে ছুটি দেওয়ার অনুরোধও জানিয়েছে, যাতে একসঙ্গে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সৃষ্টি না হয়।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ঈদুল ফিতরের যাত্রাকালে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৫১ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, শুধু মার্চ মাসেই দেশে ৫৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩২ জন নিহত হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।