এই হজে তিনি মুসলিম উম্মাহর উদ্দেশ্যে যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন, তা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও নৈতিক ঘোষণাপত্র হিসেবে বিবেচিত।
দশম হিজরিতে মহানবী (সা.) হজ পালনের ঘোষণা দিলে মদিনা ও আশপাশের অঞ্চল থেকে অসংখ্য সাহাবি তাঁর সঙ্গে হজযাত্রায় অংশ নেন। প্রায় সোয়া লাখ সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মক্কায় পৌঁছান এবং ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণই ‘খুতবাতুল বিদা’ বা বিদায়ি ভাষণ নামে পরিচিত।
ভাষণের শুরুতে মহানবী (সা.) বলেন,
“হে মানুষ! মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনো। হয়তো এ বছরের পর তোমাদের সঙ্গে আর একত্রিত হওয়ার সুযোগ হবে না।”
তিনি জাহেলি যুগের সব অন্যায়, বৈষম্য ও কুসংস্কার পরিত্যাগের আহ্বান জানান এবং মানবতার ভিত্তিতে নতুন সমাজ গঠনের নির্দেশ দেন।
মহানবী (সা.) বলেন, সব মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই এবং আরবের ওপর অনারব কিংবা শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; একমাত্র তাকওয়া বা আল্লাহভীতিই মর্যাদার মাপকাঠি।
নারীর অধিকার সম্পর্কে তিনি বলেন, নারীদের সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে। পুরুষের যেমন নারীর ওপর অধিকার রয়েছে, তেমনি নারীরও পুরুষের ওপর অধিকার রয়েছে। স্ত্রীদের প্রতি অত্যাচার না করার জন্য তিনি বিশেষভাবে সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেন,
“তোমাদের জান, মাল ও ইজ্জত যেমন পবিত্র এই মাস, এই শহর ও এই দিনের মতো, তেমনি পবিত্র।”
এই ভাষণে মহানবী (সা.) সুদ, শোষণ, বংশগৌরব, অন্যায় হত্যা, চুরি, ব্যভিচার ও শিরক থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে দাস-দাসীদের প্রতি মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি মুসলমানদের কোরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন,
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না— আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাহ।”
মহানবী (সা.) ঘোষণা দেন যে তাঁর পর আর কোনো নবী আসবেন না এবং উপস্থিত সাহাবিদের নির্দেশ দেন তাঁর বাণী অনুপস্থিত মানুষের কাছেও পৌঁছে দিতে।
ভাষণের শেষাংশে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“হে আল্লাহ! আমি কি তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি?”
তখন উপস্থিত জনতা সমস্বরে জবাব দেন, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।”
এরপর তিনি বলেন,
“হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো।”
বিদায় হজের এই ভাষণ মানবতা, ন্যায়বিচার, সাম্য, নারী অধিকার ও সামাজিক শান্তির এক অনন্য দলিল। আজও মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র মানবজাতির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১২১৮; সীরাতে ইবনে হিশাম; সীরাতে মুস্তাফা।