ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ক্ষোভ কি নতুন? দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তর হলো- না।
গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার যেসব ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে, তা উদ্বেগজনক একটি বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে। ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের শিশু লামিয়া, মুন্সিগঞ্জে দশ বছরের শিশু, পাবনায় পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী, সিলেটে আরেক চার বছরের শিশু- এ ধরনের ঘটনার তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। কয়েক মাস আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি শিশুর ওপর নৃশংস নির্যাতনের ঘটনাও দেশকে নাড়া দিয়েছিল। তারও আগে মাগুরার আছিয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী প্রতিবাদ হয়েছিল।
প্রতিবারই আমরা একটি পরিচিত চিত্র দেখি। ঘটনার পরপরই জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়, দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ শুরু হয়। এরপর কিছুদিন পর সেই আলোচনার জায়গা দখল করে নেয় অন্য কোনো নতুন ঘটনা। কিন্তু মূল প্রশ্নগুলো রয়ে যায়।
কেন শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে? বিদ্যমান আইন ও শাস্তির ব্যবস্থা কি যথেষ্ট নয়? নাকি সমস্যার শিকড় আরও গভীরে?
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে। ধর্ষণের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। ২০২০ সালে আইনে সংশোধন এনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। তখন অনেকেই আশা করেছিলেন, কঠোর শাস্তির ফলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
এর একটি কারণ হতে পারে, শাস্তির মাত্রা বাড়ানো আর অপরাধ প্রতিরোধ করা সবসময় একই বিষয় নয়। অপরাধবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, অপরাধী অনেক সময় শাস্তির ভয় নয়, বরং ধরা পড়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করে। অর্থাৎ দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার অনেক ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির চেয়েও কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশে আলোচিত অনেক ঘটনায়ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিচার বিলম্বিত হলে সমাজে একটি নেতিবাচক বার্তা যায়।
তবে সমস্যাটি কেবল আইনি নয়; এটি সামাজিকও।
পুলিশের কর্মকর্তারা প্রায়ই সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক সংকট, মাদকাসক্তি এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন। এসব বিষয়কে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ অপরাধ হঠাৎ করে তৈরি হয় না; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের নানা প্রভাবের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে।
ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিল নবম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আনে- একজন কিশোর কীভাবে এমন অপরাধপ্রবণ আচরণের দিকে যেতে পারে?
এ প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। তবে শিশু ও কিশোরদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ, প্রযুক্তির ব্যবহার, পারিবারিক তদারকি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক শিক্ষার বিষয়গুলো নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশে এখনও বয়স-উপযোগী যৌন ও নিরাপত্তা শিক্ষা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা খুব সীমিত। অনেক পরিবার এ বিষয়গুলো এড়িয়ে চলে। অথচ শিশুদের নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া জরুরি।
শিশুকে জানাতে হবে, কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, কেউ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করলে কী করতে হবে, কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং কাকে জানাতে হবে।
এখানে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র- তিন পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো সামাজিক নীরবতা। যৌন সহিংসতার ঘটনা এখনও বহু ক্ষেত্রে পরিবারগুলো প্রকাশ করতে চায় না। সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় অনেক ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। এর ফলে অপরাধীরা অনেক সময় আরও বেশি সাহস পায়।
উচ্চ আদালত ২০০৯ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি নীতিমালা দিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়নি। এ বিষয়েও নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবার সুযোগ রয়েছে।
তবে শুধু আইন করে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং মূল্যবোধের চর্চাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিশু নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক সচেতনতা তৈরির কাজও প্রয়োজন। একই সঙ্গে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও সক্রিয় হতে হবে।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। একটি দেশের শিশু কতটা নিরাপদ, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
রামিসা, লামিয়া কিংবা আছিয়া- এরা শুধু কয়েকটি নাম নয়; এরা একটি বড় বাস্তবতার প্রতীক।
প্রতিটি ঘটনার পর আমরা যদি শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করেই থেমে যাই, তাহলে হয়তো কিছুদিন পর আবার নতুন কোনো নাম আমাদের সামনে আসবে। কিন্তু যদি আমরা সমস্যার গভীরে গিয়ে কারণ খুঁজতে পারি এবং প্রতিরোধের কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারি, তাহলে হয়তো একসময় এমন সংবাদ কমে আসবে।
শিশুদের আর্তনাদ আর কত শুনবে বাংলাদেশ- প্রশ্নটি তাই আজ কেবল রাষ্ট্রের প্রতি নয়, সমাজের প্রতিও।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
চেয়ারম্যান: অপরাধ মুক্ত বাংলাদেশ চাই