উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী এবং দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্যারালাইসিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় তিনি নিবিড় পরিচর্যায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মৃত্যুকালে তিনি একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী, আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
মৃত্যুর পর সোমবার বাদ মাগরিব রাজধানীর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক ব্যক্তিত্ব, শুভানুধ্যায়ী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জানাজা শেষে মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়। পরদিন নিজ জেলা ভোলায় নেওয়ার পর জোহরের নামাজ শেষে ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তাঁর বাবা মৌলভী আজহার আলী এবং মা ফাতেমা বেগম।
শিক্ষাজীবনে তিনি ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং পরে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। ১৯৬৬-৬৭ সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) এবং ১৯৬৮-৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ভিপি নির্বাচিত হন।
১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তিনি অন্যতম নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতা হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। সে সময় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ। ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিব বাহিনীর চার আঞ্চলিক প্রধানের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।
তোফায়েল আহমেদ দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন। তিনি মোট নয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিভিন্ন সময়ে শিল্প, বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৬ সালে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। রাজনৈতিক কারণে একাধিকবার কারাবরণও করেন। দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
ছাত্রনেতা, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক সংগঠক—বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশ হয়ে থাকবেন।
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন এবং সংসদীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় সক্রিয় থাকা এই প্রবীণ রাজনীতিকের মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।