নিজস্ব প্রতিবেদক
কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দিতে নতুন করে সার ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুষ, তদবির ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই না হলেও বিষয়টি নিয়ে আবেদনকারী ও কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন ডিলার নিয়োগে নির্ধারিত নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ, আবেদনকারীদের যোগ্যতা স্বচ্ছভাবে যাচাই এবং কোনো ধরনের অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্তের দাবি উঠেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬ বাস্তবায়নে গত ৩০ আগস্ট নোটিশ জারি করা হয়েছে। এর আগে ১০ আগস্ট সংশোধিত নীতিমালাও প্রকাশ করা হয়। নতুন কাঠামোর আওতায় সার বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি নীতিমালার আওতায় আবেদন যাচাই-বাছাই, স্থানীয় পর্যায়ে সুপারিশ এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন এলাকার আবেদনকারীদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগে জানা গেছে, নির্ধারিত সরকারি ফি ও জামানতের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে তদবিরের চেষ্টা চলছে। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা কিংবা চূড়ান্ত নিয়োগ পাওয়ার আশায় বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কথাও বলা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত, কোথায় কত টাকা লেনদেন হয়েছে কিংবা অভিযোগের সত্যতা কতটা—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
রাজশাহী ও রংপুরসহ কয়েকটি এলাকায় নতুন ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের কথাও সামনে এসেছে। কোনো কোনো আবেদনকারী দাবি করছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশ পাওয়ার চেষ্টা চলছে। আবার প্রশাসনের কোনো কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে কাগজপত্রের ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও আবেদন গ্রহণ বা তালিকাভুক্তির সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা থাকলে তা শুধু নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, ভবিষ্যতে সার বিতরণ ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অবশ্য অনিয়মের অভিযোগের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন যাচাই করে যোগ্য আবেদনকারীদের তালিকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠাচ্ছেন। চূড়ান্ত নিয়োগের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেওয়া হবে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থ দাবি করলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত ডিলারের বাস্তব ব্যবসায়িক সক্ষমতা, গুদাম সুবিধা, সার সংরক্ষণ ও পরিবহনের সক্ষমতা এবং কৃষকের কাছে নিয়ম অনুযায়ী সার পৌঁছে দেওয়ার সামর্থ্য। শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সুপারিশ কিংবা আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কোনো অনভিজ্ঞ ব্যক্তি ডিলার হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সার একটি কৌশলগত কৃষি উপকরণ। মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাজারে সারের সরবরাহ ব্যাহত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ে। তাই নতুন ডিলার নিয়োগকে কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়োগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়ও জড়িত। এ কারণে প্রতিটি আবেদনকারীর যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রকৃত চাহিদা ও বিতরণ সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টরা কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—আবেদনকারীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার কারণ নথিভুক্ত করা, যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া লিখিতভাবে সংরক্ষণ, সুপারিশের ভিত্তি স্পষ্ট রাখা, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ডিলারের তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা রাখা। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি সরকারি নির্ধারিত অর্থের বাইরে টাকা দাবি করলে তার বিরুদ্ধে প্রমাণসহ অভিযোগ করার সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নতুন নীতিমালার উদ্দেশ্য যদি সার বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে ঘুষ বা তদবিরের অভিযোগ উঠলে তা এড়িয়ে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, আবেদন ও সুপারিশ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি কিংবা অন্য যে কেউ হোন—প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকা দরকার।
কৃষকের স্বার্থেই নতুন সার ডিলার নিয়োগে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যোগ্য, অভিজ্ঞ ও সক্ষম ব্যক্তিদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের পাশাপাশি বিদ্যমান ডিলারদের ভবিষ্যৎ অবস্থানও নীতিমালার আলোকে স্পষ্ট করার দাবি রয়েছে। শেষ পর্যন্ত নতুন ডিলার নিয়োগের সাফল্য নির্ভর করবে কাগজে-কলমে কতজন নিয়োগ পেলেন তার ওপর নয়; বরং কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে সঠিক পরিমাণে, সঠিক দামে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সার পৌঁছানো গেল কি না—তার ওপর।
যু/২৫/০৯