ক্রাইম রিপোর্টার, চট্টগ্রাম।
চট্টগ্রাম নগরীর ডবল মুড়িং থানাধীন আগ্রাবাদ বেপারীপাড়া কাঁচাবাজার পটিয়ার দিঘি এলাকায় দীর্ঘদিনের চলাচলের পথ নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রায় ১০০টি পরিবারের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে বাউন্ডারি নির্মাণ এবং এর দুই দিনের মাথায় স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে সেই লোহার এংগেল ও প্রোপাইল টিনের উচ্ছেদএর করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন দুই পক্ষ। এ ঘটনায় উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছেন।
ভুক্তভোগী শফি গং ও সোলায়মান গংয়ের দাবি, প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বছর ধরে এলাকার শতাধিক পরিবার প্রায় ১৬৫ ফুট দীর্ঘ ও ১৪ ফুট প্রশস্ত একটি রাস্তা দিয়ে চলাচল করে আসছেন। তাদের দাবি, চলাচলের পথের জন্য ১১৪২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে ১০৭৮৪ দাগের দুই শতক জমি কেনা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে এটি এলাকার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তাদের অভিযোগ, প্রায় ২৫ বছর আগে ইঞ্জিনিয়ার “এ বি সিদ্দিক” রাস্তার পাশের জমি ক্রয় করে সেখানে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করেন। তবে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে হঠাৎ করে ৫০-৬০ জন বহিরাগত লোক নিয়ে এসে দীর্ঘদিনের চলাচলের পথ বন্ধ করে লোহার এংগেল দিয়ে টিনের বাউন্ডারি নির্মাণ করা হয়। এতে প্রায় ১০০ পরিবারের স্বাভাবিক যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাউন্ডারি নির্মাণের ফলে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। এমনকি পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রিকশা বা অন্য কোনো যানবাহন প্রবেশের সুযোগও রাখা হয়নি।
তারা আরও দাবি করেন, ওই রাস্তার নিচ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস, পানি ও সুয়ারেজ লাইনের সংযোগ রয়েছে। পাশাপাশি পিডিবির বিদ্যুতের খুঁটিও রয়েছে। তাদের প্রশ্ন, জায়গাটি যদি সম্পূর্ণ ব্যক্তিমালিকানাধীন হতো, তাহলে এতগুলো সরকারি সেবা-সংযোগ কীভাবে ওই পথ দিয়ে স্থাপন করা হলো?
এ অবস্থায় দীর্ঘদিনের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা একপর্যায়ে একত্রিত হয়ে নির্মিত বাউন্ডারি উচ্ছেদ করে চলাচলের পথ উন্মুক্ত করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য শফি গং,মোক্তার গং ও সোলায়মান গংয়ের কয়েকজন সদস্য অভিযোগ করে বলেন, আদালতের সুস্পষ্ট আদেশ থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে ৫০ থেকে ৬০ জন বহিরাগত লোক নিয়ে এসে হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে প্রোফাইল টিন দিয়ে বাউন্ডারি নির্মাণ করা হয়।
তাদের ভাষ্য, এতে নারী-শিশুসহ শতাধিক মানুষ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই সম্মিলিতভাবে বাউন্ডারি উচ্ছেদ করে যাতায়াতের পথ উন্মুক্ত করেছেন তারা।
জমির মালিকপক্ষের দাবি, জায়গা জবরদখলের চেষ্টা
অন্যদিকে, নালিশি ভূমির মালিক ইঞ্জিনিয়ার “এ বি সিদ্দিকে’র পক্ষে তার ম্যানেজার নওশের আলী খান” ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।
আদালতের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালতের আদেশটি বাদীপক্ষের পক্ষে এবং বিবাদীপক্ষের বিরুদ্ধে। নালিশি জমিটি তাদের স্বত্ব ও দখলীয় এবং সরকারি রেকর্ডে মালিকানাধীন সম্পত্তি।
তিনি দাবি করেন, প্রতিপক্ষের চলাচলের সুবিধার্থে ১১৪২/১৯৮০ নম্বর দলিলমূলে কেনা দুই শতক জমির অংশটুকু চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ওই সীমানা ডবলমুরিং থানার এসআই আসলাম সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেছেন বলেও তিনি জানান।
নওশের আলী খানের ভাষ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এবং অক্টোবরের প্রথম দিকে প্রতিপক্ষের চলাচলের জন্য ৬ ফুট প্রস্থ ও ১৪৪ ফুট দৈর্ঘ্যের পথ উন্মুক্ত রেখে প্রায় ১৭০ ফুট দীর্ঘ ও ৭ ফুট উচ্চতার প্রোফাইল টিন ও লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে সীমানা পার্টিশন নির্মাণ করা হয়। এর ভেতরে দেয়াল নির্মাণের কাজ চলছিল।
তিনি আরও জানান, প্রতিপক্ষের হুমকি-ধামকির কারণে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তারা মিচ মামলা নং ১৩৭৩/২৬ দায়ের করেন। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় আদালত নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ডবলমুরিং থানার ওসিকে সহযোগিতার নির্দেশ দেন বলে তার দাবি।
কিন্তু তার অভিযোগ, গত ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ দুপুর ১টার দিকে প্রতিপক্ষের প্রত্যক্ষ মদদে ৭ থেকে ৮ জন অস্ত্রধারী এবং ৩০ থেকে ৪০ জন মিস্ত্রি ও শ্রমিক তাদের স্টিলের পার্টিশন ভাঙচুর করে। পরে মিনি ট্রাক ও মাথায় বহন করে মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়। কিছু মালামাল জসিম উদ্দিন ভূঁইয়ার বিতর্কিত নির্মাণাধীন ভবনের নিচতলায় পাওয়া গেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
নওশের আলী আরও অভিযোগ করেন, একই দিন জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া তাদের দায়ের করা মামলার বিষয়টি গোপন রেখে মিচ মামলা নং ১৪৩২/২৬ দায়ের করেন। তার দাবি, প্রকৃতপক্ষে ৬ ফুট × ১৪৪ ফুট চলাচলের পথের পরিবর্তে তাদের ১০৭৮৪ দাগের প্রায় চার শতক জমি দখল করে ১৫ ফুট প্রশস্ত ও ১৫৯ ফুট দীর্ঘ রাস্তা হিসেবে ব্যবহার শুরু করা হয়েছে।
বিএস রেকর্ড নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন দাবি
জমির মালিকপক্ষের প্রতিনিধি নওশের আলী খান জমির খতিয়ান, দলিল, খাজনার দাখিলা এবং সীমানা পার্টিশনের অবস্থান দেখিয়ে বলেন, প্রায় ২৫ থেকে ২৬ বছর আগে ইঞ্জিনিয়ার এ বি সিদ্দিক আবু আহম্মদ গংয়ের কাছ থেকে সম্পত্তিটি ক্রয় করেন। পরে তার নামে ৩২৪৫/১ নম্বর খতিয়ান সৃষ্টি হয় এবং ১৪৩২ বাংলা হালসন পর্যন্ত নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে জমিটি ভোগদখলে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিপক্ষ যে শতাধিক পরিবারের সর্বজনীন চলাচলের রাস্তার দাবি করছেন, তা সঠিক নয়। তাদের দাবি সত্য হলে ১৯৯০ সালের সর্বশেষ বিএস জরিপে ওই জায়গা রাস্তা হিসেবে রেকর্ড হওয়ার কথা ছিল।
তার বক্তব্য, প্রতিপক্ষ ১৯৮০ সালে চলাচলের জন্য দুই শতক জমি কেনার সময় বর্তমান বিরোধপূর্ণ প্রায় চার শতক জমিও কিনে নিলে আজকের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
তিনি আরও দাবি করেন, ১০৭৭ দাগের দক্ষিণ পাশে ৬ ফুট × ৯৬ ফুট চলাচলের পথ রয়েছে এবং সেখানে শফি ও মুক্তার হোসেনের দুটি যাতায়াতের গেট এখনো বিদ্যমান। জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া ওই পথের পরিবর্তে নতুনভাবে রাস্তা প্রশস্ত করে গেট নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নওশের আলী খানের দাবি, জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া সিডিএকে তথ্য দিয়ে ১০ তলা ভবনের নকশা অনুমোদন করিয়েছেন এবং রাস্তা প্রশস্ত করার বিষয়ে এক মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জসিম উদ্দিন ভূঁইয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের বক্তব্য
ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ডবলমুরিং থানার এসআই মো. সোহাগের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উভয় পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে, এ বিষয়ে থানায় নোটিশ প্রদানকারী এসআই মো. তারেকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে ০১৬১৪-৪০৮৪৩৪ যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
নওশের আলী খান জানান, ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে জসিম উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য দুইবার সময় নির্ধারণ করা হলেও তিনি বৈঠকে উপস্থিত হননি।
দীর্ঘদিনের চলাচলের পথ, জমির মালিকানা, আদালতের আদেশ এবং বাউন্ডারি নির্মাণ ও ভাঙচুরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই বিরোধের সুষ্ঠু সমাধান চান স্থানীয় বাসিন্দারা। সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র, আদালতের আদেশ ও ভূমির প্রকৃত সীমানা যাচাই করে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত বিরোধের নিষ্পত্তি করে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের বিরোধ নিস্পত্তি হবে।