পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে শুক্রবার রাতে একটি মসজিদের লাউডস্পিকারের আওয়াজ কমানো নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধের জেরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনার ফলে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, পুলিশ ফাঁড়িতে ভাঙচুর চালানো হয় এবং ইট-পাটকেল নিক্ষেপের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাউডস্পিকারের উচ্চ শব্দ নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ কর্মকর্তারা জাহাঙ্গীর মহল্লা এলাকার ওই মসজিদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পুলিশ আওয়াজ কমানোর অনুরোধ জানালে স্থানীয় কিছু বাসিন্দার মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং তারা থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
পরবর্তীতে এই বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশ ফাঁড়ি লক্ষ্য করে ইট ও পাথর ছুড়ে হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় বেশ কয়েকটি পুলিশ এবং বেসামরিক গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকার বেশ কিছু ভিডিও চিত্রে রাস্তায় ভাঙা কাচ এবং ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
পরিস্থিতির অবনতি হলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস (কাঁদানে গ্যাস) ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরবর্তীতে আরও বড় কোনো সহিংসতা এড়াতে ওই এলাকায় এবং তার আশেপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
পুলিশ প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে, এই সহিংসতার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভাঙচুর এবং পাথর ছোড়ার ঘটনায় জড়িত অন্য অপরাধীদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভিডিও ক্লিপগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে।
আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ (ডিসিপি) পিভিজি সতীশ জানিয়েছেন যে, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা পুলিশ স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে, তাদের ভিডিও ফুটেজ এবং সিসিটিভি দেখে শনাক্ত করা হচ্ছে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্য এক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা ধ্রুব দাস জানান, পুলিশ ফাঁড়ির বাইরে জড়ো হওয়া দুটি পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কির মাধ্যমেই এই অশান্তির সূত্রপাত। তিনি বলেন, ‘‘পুলিশ সেই তর্ক থামানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু জনতার একটি অংশ পাথর ছুড়তে শুরু করে, যার ফলে পুলিশ ফাঁড়ির সামান্য ক্ষতি হয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছি এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
সহিংসতার এই ঘটনার পর কিছু স্থানীয় বাসিন্দা শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন। একই সাথে, অল্প কিছু মানুষের অপকর্মের জন্য পুরো মুসলিম সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় না দাঁড় করানোর জন্য তারা প্রশাসন ও গণমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘‘আমি মনে করি গতকাল কিছু মানুষ ভুল করেছে, কিন্তু তার দায় পুরো মুসলিম সমাজের ওপর চাপানো ঠিক নয়। ধর্ম, জাতি বা এলাকার ভিত্তিতে যদি শান্তিপূর্ণ ও আইন মান্যকারী নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তবে সাধারণ ভারতীয়রা কোথায় যাবে?’’
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, সহিংসতার জন্য দায়ীদের অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। ‘‘সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে আমরা প্রশাসনকে সম্পূর্ণ সমর্থন করি। কিন্তু সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা, মানুষকে গালিগালাজ করা এবং কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করা সংবিধান অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়,’’ তিনি বলেন।
পাশাপাশি তিনি সংবাদমাধ্যমকেও দায়িত্বশীলভাবে সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানান। ‘‘জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের কাজ হলো মাঠপর্যায়ের প্রকৃত সত্য তুলে ধরা, কোনো ধরনের অপপ্রচার বা বিভ্রান্তি ছড়ানো নয়,’’ যোগ করেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গে শব্দদূষণ সংক্রান্ত নিয়মনীতি কঠোরভাবে কার্যকর করার আবহের মধ্যেই এই সহিংসতার ঘটনাটি ঘটল। লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা যাতে মেনে চলা হয়, তা নিশ্চিত করতে রাজ্যজুড়ে প্রশাসন ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছে বলে জানা গেছে।
আদালতের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে শব্দের মাত্রা নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে হবে এবং কোনো ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কারণে জনসাধারণের যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করা যাবে না।
এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পল বলেন, শব্দদূষণের নিয়ম সব সম্প্রদায়ের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ‘‘আপনি যেকোনো ধর্মেরই হোন না কেন এবং যেকোনো অনুষ্ঠানেরই আয়োজন করুন না কেন, লাউডস্পিকারের আওয়াজ অবশ্যই অনুমোদিত সীমার মধ্যে থাকতে হবে,’’ মন্তব্য করেন তিনি।