স্টাফ রিপোর্টার | একুশে সংবাদ
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি সোহেল রানার আদালত প্রাঙ্গণে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিচার কার্যক্রম শুরুর দিন তিনি দাবি করেন, এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে ‘ডলার’ নামের এক ব্যক্তি জড়িত। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সোমবার (১ জুন) ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটির অভিযোগ (চার্জ) গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। এদিন আদালতে হাজির করার সময় এবং পরে হাজতখানায় নেওয়ার পথে সাংবাদিকদের উদ্দেশে সোহেল রানা বারবার বলেন, “ধর্ষণ করেছে ডলার, হত্যাও করেছে ডলার। আমি শুধু লাশ গুম করতে চেয়েছিলাম।”
তিনি আরও দাবি করেন, ডলার মিরপুর-১১ এলাকায় বসবাস করেন এবং রামিসাকে এনে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। তবে আদালতে বিচারকের সামনে তিনি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডলার পল্লবী এলাকারই বাসিন্দা। সোহেল রানার ভাড়া বাসা থেকে কয়েকটি বাড়ি পরেই তার বসবাস। তিনি পেশায় অটোরিকশা চালক এবং দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, অটোরিকশা চালানোর সুবাদে ডলারের সঙ্গে গ্যারেজ মেকানিক সোহেল রানার পূর্বপরিচয় ছিল। তবে ডলার কোনো ধনী ব্যক্তি নন; যদিও তার পরিবার এলাকার পুরোনো বাড়ির মালিক হিসেবে পরিচিত।
ডলারের বড় ভাই সেলিম রায়হান বলেন, “প্রায় ১৯ বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে ডলারের কোনো সম্পর্ক নেই। সে আলাদা থাকে। যদি এমন জঘন্য ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তাহলে তারও সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।”
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ওহিদুজ্জামান ভূঁইয়া জানান, তদন্তের সময় ডলার নামের একজনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে সাক্ষ্য-প্রমাণ, ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য এবং ঘটনাস্থল বিশ্লেষণে তার কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, “ঘটনার সময় ডলারের উপস্থিতির কোনো প্রমাণ নেই। চার্জশিটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করার মতো তথ্যও পাওয়া যায়নি। আসামি ও তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ও তারা ডলারের নাম উল্লেখ করেনি।”
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, সোহেল রানার সঙ্গে ডলারের পূর্বশত্রুতা রয়েছে। সে কারণেই হয়তো তাকে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া মামলাটি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণে তদন্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “অনেক সময় পেশাদার অপরাধীরা তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমকে বিভ্রান্ত করতে নতুন নতুন তথ্য সামনে আনে। সোহেল রানার বক্তব্যও তেমন একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আসামি আদালতের আনুষ্ঠানিক শুনানিতে এসব কথা বলেনি। কেবল গণমাধ্যমের সামনে বলেছে। ফলে বিষয়টি যাচাইযোগ্য প্রমাণের ওপরই নির্ভর করবে।”
অন্যদিকে আসামিপক্ষের রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ জানান, আসামি তার সঙ্গে আলাপচারিতায় ডলার নামে কোনো ব্যক্তির বিষয়ে কিছু বলেনি; বরং নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছে।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি তিনতলা ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসা আক্তারের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল রানা। পরে একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয়েছিল।
পরদিন রামিসার বাবা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে সোহেল রানা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। দ্রুত তদন্ত শেষে ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
এদিকে আদালতে সোহেল রানার নতুন দাবি ঘিরে আলোচনা তৈরি হলেও তদন্তকারী সংস্থা বলছে, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণে ‘ডলার’ নামে কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। ফলে বিচার কার্যক্রম চলবে চার্জশিটে উল্লেখিত তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই।