নিজস্ব প্রতিবেদক
সাড়ে পাঁচ দশকের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী লাল-সবুজ লোগো পরিবর্তনের লক্ষ্যে নতুন নকশা ও ধারণা আহ্বান করেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটির এই উদ্যোগ ঘিরে সংস্কৃতি অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, ইমদাদ হোসেন ও মুস্তাফা মনোয়ারের মতো বরেণ্য শিল্পীদের ভাবনা ও সৃজনশীলতায় গড়ে ওঠা বিটিভির ঐতিহাসিক প্রতীক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
গত রোববার রাতে বিটিভির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বিজ্ঞপ্তিতে ‘নতুন রূপে বিটিভি’ স্লোগান দিয়ে সাধারণ দর্শক ও ডিজাইনারদের কাছ থেকে নতুন লোগোর ধারণা আহ্বান করা হয়। আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রস্তাবিত নকশা বিটিভির নির্ধারিত ই-মেইল ঠিকানায় পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগের বিষয়ে বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিন বলেন, তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার লক্ষ্যেই দর্শকদের কাছ থেকে নতুন আইডিয়া চাওয়া হয়েছে। এটি লোগো পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় বলেও জানান তিনি।
বিটিভির মহাপরিচালক বলেন, বিটিভিকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে অনুষ্ঠানমালা, পুরোনো আর্কাইভ সংরক্ষণ, বিলিং নীতি এবং সার্বিক উপস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার আনা হচ্ছে। ঐতিহাসিক লোগোর সঙ্গে মানুষের গভীর আবেগ জড়িয়ে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সঙ্গে যুক্ত কীর্তিমান শিল্পীদের অবদান কোনোভাবেই খাটো করা হবে না। ভবিষ্যতে লোগোতে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে বিটিভির এই উদ্যোগকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটির জন্মলগ্ন থেকে যুক্ত থাকা প্রবীণ অভিনেতা কেরামত মওলা। তিনি বলেন, বিটিভির লোগোর সঙ্গে এর ইতিহাস ও সৃষ্টিশীলতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
লোগোর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, টেলিভিশন পর্দার ভেতর থেকে উদীয়মান লাল সূর্য নতুন দিনের আলো ও আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতীক। কামরুল হাসান, ইমদাদ হোসেন ও মুস্তাফা মনোয়ারের চিন্তায় গড়ে ওঠা এই প্রতীকের চেয়ে অর্থবহ লোগো তৈরি করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, ঐতিহাসিক এই প্রতীক পরিবর্তনের উদ্যোগ সমীচীন নয়।
একই ধরনের মত দিয়েছেন বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক খ ম হারুন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় জনসম্পত্তি হিসেবে বিটিভির মতো প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রতীক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিটিভির আধুনিকায়ন নির্ভর করবে মানসম্মত অনুষ্ঠান ও কনটেন্ট তৈরির ওপর। শুধু স্বাক্ষরধর্মী বা পরিচিত লোগো পরিবর্তন করলেই একটি প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর সম্ভব নয়।
বিটিভির লোগো শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয়চিহ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের টেলিভিশন সম্প্রচার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি পরিচিত প্রতীক। ফলে এর পরিবর্তনের উদ্যোগকে ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।