পরিবারের সন্দেহ পরিকল্পিত হত্যা, অপমৃত্যুর মামলা; সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করছে পুলিশ
মো. মাছুম, স্টাফ রিপোর্টার:
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস থেকে আবুল কালাম মোহাম্মদ মুরাদ প্রকাশ এ কে এম মুরাদ (৪০) নামে এক ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে উপজেলার চিওড়া ইউনিয়নের কাজীর বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়; মুরাদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এটি আত্মহত্যার ঘটনা। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
নিহত মুরাদ পাশের নাঙ্গলকোট উপজেলার রায়কোট উত্তর ইউনিয়নের উত্তর মাহিনী গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদের বড় ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চৌদ্দগ্রামের চিওড়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় ডিস, ওয়াইফাই ও ডেকোরেশন ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।
থানা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাত ১২টার দিকে ব্যবসায়িক কাজ শেষে মুরাদ চিওড়া কাজীর বাজারে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দোতলার অফিসে যান। রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে বাজারের নৈশপ্রহরীরা অফিসে তার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
সংবাদ পেয়ে চৌদ্দগ্রাম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) লিটন চাকমার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল শেষে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই দিন বিকেলে চিওড়া এলাকায় প্রথম জানাজা এবং রাত ৯টায় নিজ গ্রাম উত্তর মাহিনীতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মুরাদের মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের কেউ কেউ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে মানতে নারাজ। তাদের দাবি, মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
চিওড়া বাজারের নৈশপ্রহরীরা জানান, রাত ১২টার দিকে তারা মুরাদকে তার অফিসে ঢুকতে দেখেছেন। তাদের ভাষ্য, তিনি অফিসের নিচের মূল ফটকে ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে দেন। পরে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর স্থানীয় সিএনজি চালক শাহাদাতের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পেরে তারা অফিসের দিকে গিয়ে উঁকি দিয়ে মুরাদকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, মুরাদের পারিবারিক জীবনে দুই স্ত্রী ও উভয় সংসারে সন্তান ছিল। পারিবারিক বিরোধ বা মানসিক চাপের কারণে তিনি আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন—এমন কথাও এলাকায় শোনা যাচ্ছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুলিশও এখন পর্যন্ত আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়নি।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধারের সময় মুরাদের পরনে শর্ট প্যান্ট ও স্যান্ডো গেঞ্জি ছিল। ঘটনাটির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
নিহতের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ছেলের মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তারা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চান। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং রহস্য উদঘাটনে পুলিশের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই লিটন চাকমা বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস থেকে মুরাদের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ জানতে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
চৌদ্দগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ আরিফ হোছাইন বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুকে ঘিরে সন্দেহের কথা বলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ বা মামলা করা হলে আইন অনুযায়ী তা গ্রহণ করে তদন্ত করা হবে।
এদিকে, একজন প্রাণচঞ্চল ব্যবসায়ীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে চিওড়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় শোকের পাশাপাশি নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ ও পুলিশের তদন্তেই এ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।