• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

দক্ষিণ ইউরোপে নতুন দাবানলে বাড়িঘর ছেড়ে গেছে হাজারো মানুষ

আন্তজাতিক ডেস্ক / ২ Time View
Update : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

দক্ষিণ ইউরোপজুড়ে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া দাবানলে হাজারো মানুষকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হয়েছে। একই সঙ্গে ভয়াবহ একটি দাবানলের হুমকির কারণে সোমবারের ‘ট্যুর দ্য ফ্রান্স’-এর একটি ধাপে দর্শকদের উপস্থিতি নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ।

ফ্রান্সের ইল-সুর-তেত থেকে এএফপি জানায়, পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স, গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশে শত শত দমকলকর্মী দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। এসব আগুনে এ পর্যন্ত ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি ভূমি পুড়ে গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনের আয়তনের প্রায় তিন গুণ।

ইউরোপে আবারও তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করায় দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। স্পেনে তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। মে ও জুন মাসের তাপপ্রবাহের ভয়াবহতার ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ইউরোপ। ওই তাপপ্রবাহে হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা দায়ী করেছেন।

বিজ্ঞানীদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন তাপপ্রবাহ এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি ও তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পেরপিনিয়ানের কাছে পিরেনিজ পর্বতমালায় ছড়িয়ে পড়া দাবানলে ৪ হাজার ৬০০ হেক্টরেরও বেশি এলাকা পুড়ে যাওয়ার পর প্রায় ১০ হাজার ৫০০ মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে।

ত্রেভিলাক গ্রামের ৫৩ বছর বয়সী বাসিন্দা পাত্রিস, যিনি নিজের পদবি প্রকাশ করেননি, বলেন, ‘আগুন আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূর পর্যন্ত চলে এসেছিল। এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়বে, তা আমরা কল্পনাও করিনি। পরিস্থিতি প্রায় আতঙ্কে রূপ নিয়েছিল।’

আরেক বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী শার্লট পিনিওল বলেন, ‘রাত সাড়ে ১০টার দিকে ধোঁয়া দেখতে শুরু করি। এরপর তা ক্রমেই কাছে আসতে থাকে। রাত প্রায় ১টার দিকে পৌরসভার একজন কর্মকর্তা দরজায় এসে আমাদের চলে যেতে বলেন।’

তিনি বলেন, ‘ধোঁয়ার গন্ধ ছিল অসহনীয়।’

দর্শকশূন্য ট্যুর দ্য ফ্রান্স

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পিরেনিজ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত সোমবারের ট্যুর দ্য ফ্রান্স সাইকেল প্রতিযোগিতার তৃতীয় ধাপে সাধারণ দর্শকদের প্রবেশের অনুমতি থাকবে না।

১৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ধাপে প্রতিযোগীরা স্পেন থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ফ্রান্সে প্রবেশ করবেন। তবে এ পথে কেবল প্রতিযোগী ও তাদের সহায়ক যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে।

আঞ্চলিক প্রিফেক্ট পিয়ের রেনো দ্য লা মোত সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ কথা বলতে আমার খারাপ লাগছে, তবে অন্তত ফ্রান্সের অংশে এবার ট্যুর দ্য ফ্রান্স দর্শকশূন্যভাবেই অনুষ্ঠিত হবে।’

এদিকে, ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দ্রোম বিভাগের পার্বত্য এলাকায় আরেকটি দাবানল নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৩০০ দমকলকর্মী কাজ করছেন।

গ্রিসে একটি বনাঞ্চলের দাবানল দেশটির উত্তরাঞ্চলের থেসালোনিকিতে দুটি কারখানায় ছড়িয়ে পড়েছে। এতে আশপাশের এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং বাসিন্দাদের জানালা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা কোস্তা ব্রাভার সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন দাবানলে দুই দিনে ২ হাজার ২০০ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। সোমবারও আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছিল।

স্পেনে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা আরও দাবানলের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। রোববার আন্দালুসিয়া ও এক্সত্রেমাদুরা অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

পর্তুগালের জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির উত্তরাঞ্চলে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর বন ও ঝোপঝাড় পুড়িয়ে দেওয়া দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তবে সোমবারও দেশটির চারটি অঞ্চলে তাপপ্রবাহজনিত সতর্কতা বহাল ছিল।

এ ছাড়া ক্রোয়েশিয়ার হভার দ্বীপ এবং আলবেনিয়ার তালে এলাকায় বড় ধরনের দাবানলে শত শত হেক্টর বনভূমি, আঙুরখেত ও ঝোপঝাড় ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ব আবহাওয়া অ্যাট্রিবিউশন (ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন) নামের বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল জানিয়েছে, জুন মাসে ইউরোপে রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা গেছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া ‘কার্যত অসম্ভব’ ছিল।

দুই সপ্তাহব্যাপী তীব্র তাপপ্রবাহের পর ফ্রান্স জানিয়েছে, মাত্র এক সপ্তাহে দেশটিতে স্বাভাবিকের তুলনায় ২ হাজারের বেশি অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে স্পেন ও বেলজিয়ামেও এক হাজারের বেশি ‘অতিরিক্ত মৃত্যু’ রেকর্ড করা হয়েছে।

আগামী কয়েক দিনের জন্য পর্তুগাল, স্পেন ও ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ-সংক্রান্ত সতর্কতা আরও জোরদার করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, নতুন এ তাপপ্রবাহ সপ্তাহান্ত পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

ফ্রান্সের অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের কর্নেল এরিক বেলজিওইনো বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এখন বাস্তবতা। আমরা এর পরিণতি ভোগ করছি, অথচ এখনো জুলাই মাসের শুরু।’

পিরেনিজ অঞ্চলের দাবানলের আশপাশের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগুনের বিরুদ্ধে লড়াই করা সদস্যদের জন্য এ মৌসুম দীর্ঘ হতে যাচ্ছে। আমাদের সহযোগিতা করুন।’

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category