• শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০১:১৯ পূর্বাহ্ন
Headline
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প, শ্রমিক অসন্তোষ ও সাম্প্রতিক সহিংসতা: সংকটের কারণ, স্বার্থান্বেষী মহলের ভূমিকা ৬৭ কর্মকর্তা পরিদর্শক থেকে সহকারী পুলিশ সুপার হলেন জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বন্ধ থাকবে জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোর স্বামী নির্মাতা সিনেমার নায়িকা মেহজাবীন, সঙ্গে নিশো ‘যে মধুতে মরে, তারে বিষ দিতে নেই’ : পরীমণি ‘আমেরিকানরা যুদ্ধের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে’: ইরান কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিল ডেমোক্র্যাটরা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপর্যয়ের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তৎপরতা শুরু আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন রোনালদোর জয় দিয়ে ভারতের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ১৫তম শুরু

শিশুর কোলে শিশু: আমরা কি শুধু অবাক হব, নাকি রাষ্ট্রও জবাব দেবে?

Reporter Name / ১৩৮ Time View
Update : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও কোটি মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, ১৩ বছরের এক কিশোরীর কোলে সাত মাস বয়সী একটি শিশু। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, সে হয়তো শিশুটির বড় বোন। কিন্তু বাস্তবতা আরও নির্মম- কোলের শিশুটিই তার সন্তান।

এই একটি দৃশ্য যেন হাজার পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। এটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, আইন, পরিবার ও আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

যে বয়সে একটি মেয়ের স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে ক্লাসে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা- সে বয়সেই তাকে মাতৃত্বের ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এটি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়; এটি একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়ার নির্মম বাস্তবতা।

ঘটনার অভিযুক্ত যুবকের দাবি, মেয়েটি তার সঙ্গে স্বেচ্ছায় গিয়েছিল। জন্মনিবন্ধনে বয়স ২০ বছর লেখা ছিল এবং নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়েও হয়েছিল। অন্যদিকে মেয়েটির পরিবার বলছে, এটি অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনা। এসব অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের সত্যতা আদালত নির্ধারণ করবে। কিন্তু আইনের ভাষা এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। এর নিচে কোনো বিয়ে আইনসম্মত নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে বিয়ের কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই। বহু বছর ধরেই আইন মন্ত্রণালয় এ ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে।

অর্থাৎ, একটি শিশুর বয়স গোপন করে, নোটারির কাগজ দেখিয়ে কিংবা তথাকথিত সম্মতির গল্প বলে কোনো অবৈধ সম্পর্ককে বৈধ করার সুযোগ আইনে নেই।

সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর সঙ্গে সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করার বিধান যুক্ত হয়েছে। এই পরিবর্তন শিশু সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ, একজন শিশু প্রকৃত অর্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পরিপক্ব নয়। তাই তার তথাকথিত সম্মতিকে আইন বৈধতা দেয় না।

এই ঘটনার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো জন্মনিবন্ধনের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন। যদি সত্যিই বয়স পরিবর্তন করে কোনো জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের অপরাধ নয়; এটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রতিফলন। একটি ভুল বা জাল তথ্য একটি শিশুর পুরো জীবনকে বিপন্ন করে দিতে পারে।

আমাদের সমাজেও আত্মসমালোচনার জায়গা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন কিশোর-কিশোরীদের জীবনের অংশ। কিন্তু পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজ কি তাদের নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবহারের শিক্ষা দিতে পেরেছে? সন্তান কখন, কার সঙ্গে, কীভাবে যোগাযোগ করছে- এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতনতা কি যথেষ্ট?

একইসঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। যদি কোনো পরিবার শুরুতেই অভিযোগ করে থাকে, তাহলে যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি? শিশুটিকে দ্রুত উদ্ধার করা গেলে কি আজকের এই পরিস্থিতি এড়ানো যেত না?

এই ঘটনার সবচেয়ে করুণ চরিত্র সম্ভবত সেই সাত মাসের শিশু। জন্মের পর থেকেই সে আইনি বিরোধ, অভিভাবকত্বের মামলা এবং সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রে। অথচ তার কোনো দোষ নেই। একইভাবে ১৩ বছরের শিশুমাও আসলে একজন ভুক্তভোগী, যার শৈশব, শিক্ষা, মানসিক বিকাশ এবং স্বাভাবিক জীবন একসঙ্গে বিপর্যস্ত হয়েছে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা নয়; ভুক্তভোগী শিশুর চিকিৎসা, মানসিক পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জন্মনিবন্ধন জালিয়াতি, নোটারির অপব্যবহার এবং বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে।

একটি ভাইরাল ভিডিও কয়েকদিন আলোচনায় থাকে, তারপর নতুন কোনো ঘটনা সেটিকে চাপা দেয়। কিন্তু এই শিশুটির জীবন কোনো ট্রেন্ড নয়। তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর কখনো ফিরে আসবে না।

তাই এই ঘটনাকে শুধুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচিত বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আমাদের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধ- সবকিছুর জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা।

প্রশ্ন একটাই- আমরা কি শুধু ১৩ বছরের এক শিশুমাকে দেখে বিস্মিত হব, নাকি এমন আর কোনো শিশুর কোলে যেন আরেকটি শিশু না আসে, সেই বাংলাদেশ গড়তে সত্যিই কার্যকর পদক্ষেপ নেব?

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category