বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, শিল্প-বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা, বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্রগুলো ক্রমেই ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। এর ফলে রাজধানী যেমন দেশের উন্নয়নের প্রতীক হয়েছে, তেমনি অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, যানজট, পরিবেশ দূষণ, আবাসন সংকট এবং নাগরিক দুর্ভোগেরও কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আজ প্রশ্ন হলো—ঢাকার এই সংকটের সমাধান কোথায়?
অনেকেই মনে করেন, আরও ফ্লাইওভার, আরও মেট্রোরেল, আরও এক্সপ্রেসওয়ে বা নতুন নতুন সড়ক নির্মাণই সমস্যার সমাধান। বাস্তবে এসব অবকাঠামো উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু এগুলো মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ সমস্যার শিকড় অবকাঠামোর ঘাটতিতে নয়; বরং উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সেবার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণে।
দেশের একজন তরুণ যখন চাকরির খোঁজে বের হন, তাঁর প্রথম লক্ষ্য হয় ঢাকা। একজন জটিল রোগের রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসেন। একজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানীমুখী হন। এমনকি অনেক সাধারণ প্রশাসনিক কাজেও নাগরিকদের রাজধানীতে আসতে হয়। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করছেন, যা রাজধানীর ওপর ক্রমাগত নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে দেশের বহু জেলা ও উপজেলায় পর্যাপ্ত জনশক্তি, কৃষি সম্ভাবনা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিল্প স্থাপনের উপযোগী পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও সেখানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হয়নি এবং কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ রাজধানীমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে।
রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে হলে প্রথমেই উন্নয়নের দর্শনে পরিবর্তন আনতে হবে। উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে শুধু ঢাকাকে নয়, দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। যেখানে কাঁচামাল আছে সেখানে শিল্প গড়ে তুলতে হবে; যেখানে কৃষি উৎপাদন বেশি, সেখানে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপন করতে হবে; যেখানে দক্ষ জনশক্তি আছে, সেখানে তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে।
প্রতিটি জেলায় পরিকল্পিত শিল্পপার্ক, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণ হলে লাখো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মানুষ নিজ এলাকায় কাজের সুযোগ পেলে শুধু চাকরির জন্য রাজধানীতে পাড়ি জমাতে হবে না। এতে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপও ধীরে ধীরে কমে আসবে।
স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা জরুরি। প্রতিটি বিভাগে আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল, ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর বাইরে গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট এবং উদ্ভাবন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এতে দেশের মেধা ও সম্পদ রাজধানীতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কেন্দ্রীভূত হবে না।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণও এখন সময়ের দাবি। নাগরিকদের অধিকাংশ সরকারি সেবা যদি বিভাগ ও জেলা পর্যায় থেকেই নিশ্চিত করা যায় এবং ই-গভর্ন্যান্স আরও বিস্তৃত করা যায়, তাহলে হাজার হাজার মানুষকে ছোট ছোট প্রশাসনিক কাজের জন্য ঢাকায় আসতে হবে না। এতে সময়, অর্থ এবং জ্বালানি—সবকিছুর সাশ্রয় হবে।
একই সঙ্গে রাজধানীর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাও উন্নত করতে হবে। আধুনিক গণপরিবহন, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পথচারীবান্ধব ফুটপাত, পরিকল্পিত হকার জোন, পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ—এসব উদ্যোগ নগরজীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক করতে পারে। তবে এগুলো তখনই সর্বোচ্চ সুফল দেবে, যখন রাজধানীর ওপর মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমবে।
বিকেন্দ্রীকরণ শুধু ঢাকার সমস্যা সমাধানের কৌশল নয়; এটি একটি শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তিও। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে রাজধানীর বস্তি সম্প্রসারণ, পরিবেশ দূষণ ও সামাজিক চাপও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উন্নয়নের নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এখন সময় এসেছে সেই উন্নয়নের সুফলকে রাজধানীর সীমানার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার। একটি আধুনিক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়তে হলে উন্নয়নের কেন্দ্র হতে হবে সমগ্র বাংলাদেশ।
রাজধানীকে বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় রাজধানীতে আরও মানুষ আনা নয়, বরং মানুষের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তাদের নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়া। উন্নয়নের এই নতুন দর্শনই হতে পারে আগামী বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রযাত্রার ভিত্তি।
কারণ, একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়তে শুধু একটি শক্তিশালী ঢাকা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিটি বিভাগ, প্রতিটি জেলা, প্রতিটি উপজেলা এবং প্রতিটি গ্রাম। রাজধানীকে বাসযোগ্য করতে হলে উন্নয়নের ভারসাম্য নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
জি. এম. ফারুক হোসেন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
দৈনিক একুশে সংবাদ