যুক্তরাষ্ট্রের দূত জ্যারেড কুশনার সোমবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন। এর আগে তিনি মিসরে হামাস নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত গাজা শান্তি পরিকল্পনা পুনরুজ্জীবিত করাই ছিল এ আলোচনার লক্ষ্য। তবে, ইসরাইল এখন পর্যন্ত পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
হামাস ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার সর্বশেষ ধাপ অনুমোদন করার দুই সপ্তাহ পর এ বৈঠক হচ্ছে। নেতানিয়াহু পরিকল্পনাটি সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, যেকোনো সমঝোতায় হামাসকে ‘সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র’ করার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
জেরুজালেম থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
ট্রাম্পের জামাতা কুশনার রোববার মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় শহর আল-আলামাইনে হামাসের নতুন নেতা খলিল আল-হাইয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনার বিষয়ে অবগত কয়েকটি সূত্র এএফপিকে এ তথ্য জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানায়, কুশনার হামাসকে ‘সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বার্তা দেন, ‘গাজা আর কখনোই ইসরাইলের জন্য সন্ত্রাসের উৎস হতে পারবে না।’
অন্য একটি সূত্র জানায়, হামাস আবারও পরিকল্পনাটির প্রতি তাদের অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছে।
পরে এক বিবৃতিতে হামাস জানায়, তারা মধ্যস্থতাকারী এবং ট্রাম্পের তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-কে ইসরাইলকে ‘রোডম্যাপ অনুমোদন করতে এবং এর বাস্তবায়নের সময়সূচি প্রণয়ন শুরু করতে’ বাধ্য করার আহ্বান জানিয়েছে।
আয়োজক মিসর প্রকাশিত একটি ছবিতে আল-হাইয়াকে দেখা যায়নি। তবে সেখানে কুশনারকে ‘বোর্ড অব পিস’-এর সদস্যদের সঙ্গে একটি টেবিলে দেখা যায়। তাদের মধ্যে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও ছিলেন। মিসরের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী কাতার ও তুরস্কও বৈঠকে যোগ দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলেছে। সংগঠনটিকে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পরই গাজা যুদ্ধ শুরু হয়।
তবে সংঘাতের অবসানের আশায় ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি যোগাযোগের বিষয়ে ক্রমেই আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এরই অংশ হিসেবে অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়। ওই চুক্তির ফলে গাজায় আটক অবশিষ্ট ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হয়।
ইসরাইলের ওপর মুসলিম দেশগুলোর চাপ-
মিসর, কাতার ও তুরস্ক—এই তিন আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশ এবং আরও পাঁচটি মুসলিম দেশ—জর্ডান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া—রোববার ইসরাইলের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের নিন্দা জানিয়েছে।
এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, শান্তি বাধাগ্রস্ত করার জন্য ‘ইসরাইল সরাসরি ও সম্পূর্ণভাবে দায়ী।’ তারা আরও বলেছে, ইসরাইলের এই প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের ‘ব্যাপক প্রচেষ্টা’ ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর জবাবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি অভিযোগ করেছে, ‘আরব দেশগুলো নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীকে পরাজিত করতে চায়।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতের এ অবস্থান নেওয়া তাৎপর্যপূর্ণ। পাঁচ বছর আগে দেশটি ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের সূচনা হয়। নেতানিয়াহু এটিকে তার সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করেন।
গাজার জন্য ‘বোর্ড অব পিস’-এর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ নেতানিয়াহুকে আশ্বস্ত করার পরও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। ম্লাদেনভ তাকে জানান, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলকে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে না।
বোর্ড এর আগে বলেছিল, হামাসের নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইসরাইল ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার শুরু করবে।
-ইসরাইলের হামলা অব্যাহত-
ট্রাম্প শান্তি পরিকল্পনার প্রচার শুরু করার পর কিছুটা বিরতির পর ইসরাইল গাজায় আবারও বিমান হামলা শুরু করেছে। তবে অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি গাজায় সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, রোববার নুসেইরাতের পশ্চিমে একটি বাড়িতে ইসরাইলি বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। হামাসের অধীনে উদ্ধারকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, ইসলামিক জিহাদের সদস্যদের হুমকির জবাবে তারা হামলা চালিয়েছে। বেসামরিক মানুষের হতাহতের সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও তারা জানায়।
সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সন্ত্রাসীরা হামলা চালানোর জন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। হুমকি দূর করতে তাদের লক্ষ্য করে নির্ভুল বিমান হামলা চালানো হয়েছে।’
খান ইউনিসের পশ্চিমে বাস্তুচ্যুত মানুষদের তাঁবুতে ইসরাইলি বাহিনী গুলি চালালে আরও কয়েকজন আহত হন বলে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে। একই এলাকায় শনিবার ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত শিশু সুহাইল শাল্লুফের মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি সামরিক অভিযানে অন্তত ১ হাজার ২৬২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
একই সময়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, তাদের পাঁচ সদস্য নিহত হয়েছেন।