সমন্বিত উদ্যোগে সংস্কার, বন্ড-ডেরিভেটিভস ও ইক্যুইটি মার্কেটে জোর দেওয়ার কথা জানালেন অর্থমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবিত ও সম্প্রসারণে সরকার ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। সমন্বিত সংস্কার ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সামগ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি। ইনশাআল্লাহ, আগামী এক বছরের মধ্যে আপনারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পরিবর্তিত চেহারা দেখতে পাবেন।’
রোববার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব সিকিউরিটিজ কমিশনসের (আইওএসসিও) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক) তানভীর শাহরিয়ার গনি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন উপস্থিত ছিলেন।
আমির খসরু বলেন, পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে সরকার ইতোমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে বাস্তবভিত্তিক উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাজারের কোনো কোনো অংশীজনের জন্য কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রচলিত অর্থায়নের উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশের আর্থিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। উচ্চ সুদে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বমানের অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশকে ‘হাই স্ট্রিট থেকে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট’-এর দিকে এগিয়ে যেতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট, ডেরিভেটিভস, সিকিউরিটাইজেশন ও ইক্যুইটি মার্কেটের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তিনি দাবি করেন, আইএমএফের কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে, কারণ সংস্থাটির কিছু শর্ত সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিশ্বের প্রখ্যাত বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন।
তিনি জানান, নিউইয়র্কে ডলার বন্ড এবং হংকংয়ে বাংলাদেশ ডেডিকেটেড ফান্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সামুরাই বন্ড ও প্যান্ডা বন্ডের মতো বৈশ্বিক আর্থিক পণ্যের মাধ্যমে দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের অর্থায়ন কাঠামো পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে হলে প্রতি বছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। শুধু প্রচলিত বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে এ বিপুল অর্থায়ন সম্ভব নয়। এজন্য আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
পুঁজিবাজার উন্নয়নে শুধু বিএসইসির একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিবেদন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, হিসাবরক্ষক, স্টক এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, অতীতে এসব প্রতিষ্ঠান অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করলেও তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ছিল না। সমন্বিত উদ্যোগের অভাব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা।
‘আমাদের কখনো সমন্বিত উদ্যোগ ছিল না’ উল্লেখ করে তিনি টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে সব অংশীজনের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পুঁজিবাজার পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে বাজারসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের স্বতঃস্ফূর্ত স্বনিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন চর্চার আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশে বিনিয়োগের সুযোগ ও আগ্রহের কোনো ঘাটতি থাকবে না। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে সময় নষ্ট না করে পুঁজিবাজারের সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে আমির খসরু বলেন, সংস্কার কার্যক্রম সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের পুঁজিবাজার আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক কাঠামোর বৃহত্তর পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।