• বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:০৭ পূর্বাহ্ন

প্রতিবাদ প্রতিরোধে আজো প্রাসঙ্গিক : বিদ্রোহী কবি 

অনলাইন ডেস্ক. / ১৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

কাজী নজরুল ইসলাম দুর্দান্ত সাহসিকতার সঙ্গে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কালে বাংলার নিপীড়িত-নির্যাতিত জনসাধারণকে জাগিয়ে তোলার কাজটি করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র।

দ্রোহ, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিকতার প্রশ্নে নজরুল ছিলেন চূড়ান্তভাবে আপসহীন।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলার মানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর কবিতা ও গান বারবার নতুন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে এসেছে। দীর্ঘ মুক্তির লড়াইয়ে নজরুল যেন বারবার হাজির হয়েছেন প্রেরণার বাতিঘর হয়ে।

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নজরুলের কলম ছিল প্রতিবাদের শক্তিশালী হাতিয়ার। তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত পত্রিকা ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার সাহস জুগিয়েছিল। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উচ্চারণ করেন এমন এক সময়ে, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলা ছিল দুঃসাহসিক রাজনৈতিক অবস্থান। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। কারাগারেও তিনি প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ হতে দেননি।

নজরুলের দ্রোহ কোনো আরোপিত বিষয় নয়, তা নিপীড়িত মানুষের অভিজ্ঞতা, বঞ্চনা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত। তাঁর বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি নয়, একই সঙ্গে সামাজিক বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, অর্থনৈতিক শোষণ ও মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নজরুলের দ্রোহ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় উপমহাদেশে যখন নানা ধারায় আন্দোলন চলছিল, তখন নজরুল তাঁর সাহিত্যকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বানে পরিণত করেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার যে দুর্দম ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, তা পরাধীন মানুষের মনে নতুন সাহস সঞ্চার করে।

‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয়োল্লাস’ ও ‘আনন্দময়ীর আগমনে’র মতো সৃষ্টিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, শৃঙ্খল ভাঙা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ গান বন্দিত্ব ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার তাঁর লেখাকে বিপজ্জনক ভেবে তাঁর রচনা বাজেয়াপ্ত করে। তাঁকে কারাবন্দি করে। কিন্তু দমন-পীড়ন তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নজরুলের প্রেরণা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। দীর্ঘ রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সংগ্রামের পর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এই সংগ্রামে নজরুলের স্বাধীনতাকামী চেতনা, বিদ্রোহী উচ্চারণ এবং সাম্য ও মানবিকতার বাণী নতুন তাৎপর্য লাভ করে। তাঁর গান ও কবিতা বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার যে আহ্বান নজরুলের সৃষ্টিতে রয়েছে, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সংগতিপূর্ণ।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নজরুলের চেতনা

স্বাধীন বাংলাদেশেও গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বারবার সামনে এসেছে। আশির দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ, রাজনৈতিক দল, শ্রমজীবী মানুষ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলন ক্রমে বিস্তৃত হয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সেই সংগ্রামে প্রতিবাদী কবিতা, গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা এ ধরনের স্বৈরাচারবিরোধী সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে সহজেই মিশে যায়। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, শৃঙ্খল ভাঙা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে সাহস তিনি তাঁর সৃষ্টিতে প্রকাশ করেছেন, তা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এই ঐতিহাসিক পরিণতি আবারও দেখিয়ে দেয়, মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। নজরুলের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার সেই প্রতিবাদী চেতনাকে ব্যাখ্যা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভিত্তি।

জুলাইয়ের রাজপথে নজরুলের গান-কবিতা ও স্লোগান

জুলাইয়ের পক্ষ মূলত দুটি। একটি জালিম আর একটি মজলুম। বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বাংলাদেশ ছিল চব্বিশের জুলাই। সেই বৈষম্য প্রথমত ছিল চাকরিপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। পরবর্তী সময়ে তা দাঁড়ায় সামগ্রিক হিসেবে। ‘ভেঙে ফেলার গান’ হিসেবে। সতেরো বছর ধরে গুম-খুন নিপীড়নের শিকার ছাত্র-শ্রমিক-জনতা নেমে আসে রাজপথে। সেই স্ফুলিঙ্গের ভেতর বারবার উচ্চারিত হয়েছে নজরুলের কবিতা-গান। প্রতিধ্বনিত হয়েছে স্লোগান হিসেবে। ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ ভাঙার আহ্বান আন্দোলনকারীদের উজ্জীবিত করেছিল।

পতিত শাসনব্যবস্থার ভুক্তভোগীরা যখন ‘আত্মদানের গরিমা’ নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল তাদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল নজরুল। নজরুলের ‘চির উন্নত মম শির’-এ প্রাণিত হয়ে বন্দুকের সামনে অনায়াসে দাঁড়িয়ে গেছেন আমাদের বীরপুরুষ আবু সাঈদরা। ধ্বংস দেখে ভয় না পেয়ে তারা নেমেছিলেন অসুন্দরের ছেদন করতে। জমানো ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল ঝঞ্ঝার মতো। সমস্বরে গেয়ে উঠেছিল ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম, মোরা ঝর্ণার মত চঞ্চল।/ মোরা বিধাতার মত নির্ভয়, মোরা প্রকৃতির মত সচ্ছল।/ আকাশের মত বাঁধাহীন,/ মোরা মরু সঞ্চার বেদুঈন,/ মোরা বন্ধনহীন জন্মুস্বাধীন, চিত্ত মুক্ত শতদল।’ নজরুলের কালজয়ী এসব গান গাইতে গাইতে কারফিউ ভেঙে, ক্ষমতাসীন দলের পেটোয়াবাহিনী, স্বশস্ত্র বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়েছে বিক্ষোভকারীরা।

জুলাইয়ের গ্রাফিতিতে নজরুল

জুলাইয়ে যখন তৎকালীন সরকার সমস্ত শক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করে আন্দোলনকে দমানোর দিকে এগোয়- সেসময় আন্দোলনকারীদের একটি কর্মসূচি ছিল দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি অঙ্কন। সেইসব গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখনে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার পঙক্তিগুলো হয়ে উঠেছিল শাসকের কূটকৌশলের বিপরীতে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার। দেয়ালে দেয়ালে পুনর্লিখন হতে থাকে ‘আমি দুর্ব্বার,/ আমি ভেঙে করি সব চুরমার!/ আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,/ আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল!/ আমি মানি নাকো কোনো আইন,/আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম, ভাসমান মাইন!/ আমি ধূর্জ্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর কাজী নজরুলকে উপনিবেশবিরোধী সবচেয়ে বড় কবি বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘উপনিবেশের ধরন বদলেছে, কিন্তু শোষেণের মাত্রা কমেনি। নজরুলের লেখা তাই বার বার ফিরে আসে। সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্যের কথাও নজরুলের লেখায় সবচেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে।’

তারিক মনজুর আরও বলেন, ‘ইউরোপীয় দর্শনে একজন ব্যক্তি ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে তখনই—যখন সে সভ্য গুণগুলো অর্জন করে। কিন্তু নজরুলের চিন্তায় ব্যাপারটি অন্যরকম। নজরুলের মতে, মানুষ জন্মগ্রহণ করা মাত্রই সে মানুষ; এর সথে অন্য কিছুর সম্পর্ক নেই। ব্যক্তির জাত, ধর্ম, রীতি, সংস্কৃতি, দেশ, বিত্ত, আচরণ—কোনো কিছুই তার মানুষ হয়ে ওঠার পথে বাধা নয়। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র যখন মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে দেখে, তখন নজরুল সব মানুষের কণ্ঠ হয়ে জেগে ওঠেন, উচ্চারিত হন।’

ইনসাফের লড়াইয়ে নজরুল সর্বদাই মজলুমের আত্মীয়, প্রাসঙ্গিক। মানুষের মুক্তির লড়াই যতদিন থাকবে, যতদিন পর্যন্ত চূড়ান্ত মুক্তি আসবে না সর্বক্ষেত্রে- রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে ও সংস্কৃতিতে ততদিন নজরুলের আবেদন ফুরাবে না। যুগ যুগ ধরে যে কোনো স্বৈরাচার, অন্যায় আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রধানতম আত্মিক ঢাল কাজী নজরুল ইসলাম। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বির্নিমাণের যে চলমান লড়াই এই লড়াইয়ে অনির্বাণ আলোকবর্তিকা হয়ে হাজির থাকবেন আমাদের দ্রোহের নজরুল। বাঙালির একান্ত আপনজন ও স্বজন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category