জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইরানের জনগণের উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ গ্রহণ করেছেন দেশটির ক্ষমতাচ্যুত শাহর ছেলে রেজা পাহলভি। তবে শনিবার তাঁর এই পুরস্কার গ্রহণকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনা ও তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। সমালোচকরা এই আয়োজনকে সম্পূর্ণ ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করেছেন।
জার্মান পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮ হাজার উৎসাহী সমর্থক পুরোনো আমলের ইরানি পতাকা হাতে এবং বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্টে রেজা পাহলভিকে স্বাগত জানান। জার্মানির উদারপন্থী এফডিপি দল-ঘনিষ্ঠ সংগঠন ‘ফ্রেডরিখ নউমান ফাউন্ডেশন’ এই পুরস্কারের আয়োজন করে।
জার্মানির প্রথম নির্বাচিত পার্লামেন্টের (১৮৪৮-১৮৪৯) ঐতিহাসিক মিলনস্থল সেন্ট পলস চার্চে দাঁড়িয়ে পাহলভি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “ইরান এমন কোনো দেশ নয় যাকে নতুন করে গণতন্ত্র শেখাতে হবে, বরং এটি এমন এক দেশ যাকে জোর করে গণতন্ত্র চর্চা থেকে দূরে রাখা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, যে দেশের মানুষ কেবল ভোটের অধিকারের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত, তারা সেই অধিকার প্রয়োগ করতেও পুরোপুরি সক্ষম।
গত বছরের শেষের দিকে ইরানে শুরু হওয়া এবং চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত চলা গণবিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেই দমনপীড়নে নিহতদের স্বজনদের অনেকে মিলনায়তনে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে পাহলভির কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। তিনি আয়োজক ফাউন্ডেশনের উদ্দেশে বলেন, ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির মানে এর চেয়ে ভালোভাবে বোঝে—এমন কোনো জাতি আপনারা আর খুঁজে পাবেন না।
পাহলভি স্পষ্ট করে জানান, তিনি এই পুরস্কার নিজের জন্য গ্রহণ করছেন না; ইরানে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি কেবল একজন ‘জিম্মাদার’ হিসেবে এটি নিজের কাছে রাখছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, একদিন তিনি তেহরানে গিয়ে এর আসল মালিকদের হাতে এটি তুলে দেবেন।
ফ্রাঙ্কফুর্টের রাস্তায় বড় ধরনের সমর্থন পেলেও রেজা পাহলভির এই পুরস্কার গ্রহণকে অনেকেই ভালোভাবে মেনে নেননি। তাঁর বাবা মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ছিলেন ইরানের শেষ শাহ এবং একজন কট্টর স্বৈরাচারী শাসক, যিনি ১৯৭৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। পাশাপাশি, ইসরায়েলের প্রতি পাহলভির প্রকাশ্য সমর্থন এবং বাবার স্বৈরাচারী শাসন থেকে নিজেকে পুরোপুরি দূরে রাখতে না পারার কারণে তিনি দীর্ঘকাল ধরে সমালোচকদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছেন।
কারাবন্দিদের প্রতিবাদ: হেস অঙ্গরাজ্যের ‘সোসাইটি ফর জার্মান-ইরানিয়ান্স’ সংগঠনের মুখপাত্র সাহার সানাই জানান, বর্তমানে ইরানের কারাগারে বন্দি প্রায় ২০০ জন রাজনৈতিক বন্দি পাহলভির এই পুরস্কার পাওয়ার প্রতিবাদে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাঁরা তাঁকে অতীতের সেই ‘স্বৈরাচারের প্রতীক’ হিসেবে বিবেচনা করেন।
রাজনৈতিক বয়কট: জার্মানির মধ্য-বামপন্থী দল এসপিডি এবং গ্রিনস পার্টির ফ্রাঙ্কফুর্ট শাখা এই অনুষ্ঠান পুরোপুরি বয়কট করে। দল দুটির মতে, পাহলভিকে কোনোভাবেই ইরানি জনগণের বৈধ প্রতিনিধি বলা চলে না।
ভৌত স্থানের নিয়ম লঙ্ঘন: উগ্র বামপন্থী দল ডি লিঙ্কের ফ্রাঙ্কফুর্ট শাখা জানায়, ঐতিহাসিক সেন্ট পলস চার্চে কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠান করা উচিত হয়নি, কারণ শহরের নিয়ম অনুযায়ী এই উপাসনালয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন নিষিদ্ধ।
সূত্র: এএফপি।
