• মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০৩:১৪ অপরাহ্ন
Headline
ঈদে প্রেক্ষাগৃহে আসছে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ নিকলীর সিংপুর বাজারে ভয়াবহ নদীভাঙন, আতঙ্কে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা সৌদিতে পৌঁছেছেন ৬৫,৫৯২ বাংলাদেশি হজযাত্রী, মৃত্যু ১৮ জনের এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের ঈদ বোনাস চেক ছাড় কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগ ঘিরে সংসদে তীব্র আলোচনা চীফ হুইপের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ ৫ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত মধ্যপ্রাচ্যে বইছে সুবাতাস : শ্রমবাজারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন : জানালেন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম ভৈরব রেল বাইপাস নির্মাণের দাবি আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে কিশোরগঞ্জবাসীর মাঝে

শিক্ষকতা ছেড়ে সফল উদ্যোক্তা হাওরাঞ্চলের হাওরকন্যা শায়লা

স্টাফ রিপোটার / ৫৯ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত জনপদে নারীদের কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী করে তোলার ক্ষেত্রে এখনো নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক নারী সংসারের গন্ডিপেরিয়ে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পান না।

তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও কেউ কেউ নিজের সাহস, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে বদলে দিচ্ছেন নিজের জীবন। বদলে দিচ্ছেন সমাজের চিত্রও।

কিশোরগঞ্জের নিকলীর হাওরকন্যা শায়লা আক্তার তেমনই একজন নারী উদ্যোক্তা। শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে সুঁই-সুতার কাজ আঁকড়ে ধরে তিনি সফলতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

একসময় হবিগঞ্জের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন শায়লা আক্তার। স্থায়ী চাকরি, সম্মানজনক পেশা—সবকিছুই ছিল তার জীবনে। কিন্তু ছোটবেলা থেকে সেলাই ও হাতের কাজের প্রতি ছিল তার অন্যরকম ভালোবাসা। সুঁই-সুতা, কাপড়ে নকশা আর হ্যান্ডপেইন্ট যেন ছিল তার মনের জগতের সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। পারিবারিক চাপে শিক্ষকতা শুরু করলেও তার মন পড়ে থাকত সৃজনশীল কাজে।

তিনি জানান, নিজের প্যাশনের দিকে ঝুঁকতে গিয়ে অবশেষে ২০১৯ সালে জীবনের বড় একটি সিদ্ধান্ত নেন শায়লা। শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে ফিরে আসেন নিজের বাড়ি কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার নগর গ্রামে।

পরিবারের অনেকেই তার সিদ্ধান্তকে ভালোভাবে নেননি। কারণ, একটি স্থায়ী চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিত ব্যবসায় নামা অনেকের কাছেই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তবে নিজের স্বপ্নের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ছিল শায়লার। সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করেই মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে শুরু করেন নিজের উদ্যোগ।

শুরুর সময় তার সঙ্গে ছিলেন মাত্র পাঁচজন কর্মী। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তার অধীনে কাজ করছেন ৪৫ জন নারীকর্মী। তাদের তৈরি পণ্য শুধু দেশের বিভিন্ন জেলাতেই নয়, বিদেশেও যাচ্ছে। দুবাই, সিঙ্গাপুর ও জর্ডানে তার তৈরি পোশাক ও হস্তশিল্পপণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে।

শায়লার ভাষ্য, ‘আমি মনে করি, আমার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস।’

ছোটবেলা থেকেই শায়লা হাতের কাজে পারদর্শী ছিলেন। তিনি জানান, তার বড় বোনের কাছ থেকেই মূলত তিনি সেলাই ও নকশার কাজ শেখেন। এসএসসি পরীক্ষার পর অবসর সময়ে নিজের হাতে কিছু ওয়ালম্যাট তৈরি করেছিলেন। পরে সেগুলো আত্মীয়-স্বজনদের উপহার দেন। তার কাজের প্রশংসা করতে থাকেন সবাই। এরপর আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা বিভিন্ন ধরনের কাজের অর্ডার দিতে শুরু করেন।

তখন থেকেই টুকটাক কাজ করে নিজের আয় শুরু হয় তার। তিনি বুঝতে পারেন, এই কাজকে পেশা হিসেবে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু পরিবার থেকে তেমন সমর্থন পাননি। পরিবারের সদস্যরা চেয়েছিলেন, তিনি চাকরি করুন। পরে হবিগঞ্জের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। তবে নিজের ভেতরের স্বপ্ন কখনো হারিয়ে যায়নি।

২০১৯ সালে বাবার মৃত্যু তার জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। বাবাকে হারানোর পর তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন এবং নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে পুরোপুরি মনোযোগ দেন।

শায়লার শিক্ষাগত যোগ্যতাও কম নয়। তিনি ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পাশাপাশি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ, ফ্যাশন ডিজাইনিং ও হ্যান্ডপেইন্ট বিষয়ে একাধিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এসব প্রশিক্ষণ তার দক্ষতাকে আরও শাণিত করেছে।

নিজের ব্যবসা দাড় করানোর পাশাপাশি সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের নিয়েও ভাবতে শুরু করেন শায়লা। তিনি মনে করেন, গ্রামের অনেক নারী দক্ষ হলেও সুযোগের অভাবে নিজেদের প্রতিভা কাজে লাগাতে পারেন না। বিশেষ করে অনেক নারী ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাই তিনি নারীদের ঘরে বসে আয় করার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেন।

এই চিন্তা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘আশফিয়া প্রশিক্ষণকেন্দ্র’। এখানে নারীদের বিনা মূল্যে সেলাই, বুটিক, কুশিকাটা, ব্লকপ্রিন্ট, হ্যান্ডপ্রিন্ট ও নকশিকাঁথার কাজ শেখানো হয়।

২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ নারী এই কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাদের অনেকেই এখন নিজেরা উদ্যোক্তা হয়েছেন। কেউ কেউ আবার শায়লার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।

সম্প্রতি নিকলীর নগর গ্রামে শায়লার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রায় ৫০ জন নারী। কেউ কাপড়ে নকশা করছেন, কেউ সেলাই করছেন, আবার কেউ ব্লকপ্রিন্টের কাজ করছেন। পুরো পরিবেশজুড়ে যেন কর্মচাঞ্চল্য আর আত্মবিশ্বাসের গল্প।

প্রশিক্ষণার্থী জেসমিন আক্তার বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি এখানে সেলাই ও নকশার কাজ শিখছেন। ইতোমধ্যে তিনি নিজের আয় শুরু করেছেন। এই আয় দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহযোগিতা করতে পারছেন। তাঁর মতো আরও অনেক তরুণী এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের জীবন বদলে ফেলছেন।

শায়লা বলেন, গ্রামের অনেক মেয়ের অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগের অভাবে তারা পিছিয়ে থাকে। তিনি চান, নারীরা কারও করুণা বা দয়ার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের উপার্জনে চলুক।

তার ভাষায়, ‘আমি সব সময় মেয়েদের বলি, নিজেদের আয় করার চেষ্টা করতে হবে। সেলাই কিংবা হাতের কাজ শিখলে বাড়িতে বসেই আয় করা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, অনেক নারী পরিবারের কারণে বাইরে যেতে পারেন না। তাদের জন্য তিনি বাড়িতে গিয়ে কাজ বুঝিয়ে দেন। এতে নারীরা ঘরে বসেই কাজ করতে পারেন এবং আয়ও করতে পারেন। এই উদ্যোগের ফলে অনেক পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরেছে।

বর্তমানে শায়লার তৈরি হ্যান্ডপেইন্টের পাঞ্জাবি, জামা, নকশিকাঁথা, কুশিকাটার পণ্য ও বিছানার চাদরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নিয়মিত অর্ডার আসে। অনলাইনেও তিনি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। ‘আশফিয়া ড্রিম ফ্যাশন’ নামের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি হচ্ছে দেশ-বিদেশে।

ব্যবসা থেকে এখন প্রতি মাসে নিয়মিত আয় করছেন শায়লা। কর্মীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার পরও তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তবে অর্থ উপার্জনের চেয়ে নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।

নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. শাকিলা পারভীন বলেন, শায়লা আক্তার প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের নারীদের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ। সামাজিক নানা বাধা অতিক্রম করে তিনি সফল হয়েছেন এবং অন্য নারীদেরও স্বাবলম্বী করে তুলতে কাজ করছেন। তার এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

হাওরাঞ্চলের মতো পিছিয়ে পড়া এলাকায় শায়লার এই উদ্যোগ এখন অনেক নারীর স্বপ্ন দেখার প্রেরণা হয়ে উঠেছে। শিক্ষকতার নিরাপদ চাকরি ছেড়ে যে সাহসী সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন, সেটিই আজ তার সফলতার মূল ভিত্তি। নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করে তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বদলে দিচ্ছেন শত শত নারীর জীবনও।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা