ঢাকা রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দম্পতি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
আজ রোববার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। এই অর্থদণ্ডের টাকা ভুক্তভোগী রামিসার পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসামিরা এই টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে তা আদায়ের নির্দেশ দেন আদালত। রায় ঘোষণার আগে কঠোর নিরাপত্তায় আসামিদের কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। রায়ের পর তাদের সাজা পরোয়ানা দিয়ে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়।
এর আগে গত ৪ জুন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেছিলেন। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে এই দৃষ্টান্তমূলক রায় দেওয়া হলো।
যেভাবে ঘটেছিল সেই নৃশংসতা: মামলার এজাহার ও অভিযোগ থেকে জানা যায়, নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে নিজের ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তাদের কক্ষে ডেকে নিয়ে যায়।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য তার মা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে আসামিদের কক্ষের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়া না পেয়ে রামিসার বাবা-মা ও ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা শিশু রামিসার খণ্ডিত ও রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান।
ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত ২০ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
দ্রুততম সময়ে তদন্ত ও বিচার: মামলা দায়েরের পর গত ২০ মে প্রধান আসামি সোহেল রানা (৩০) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনায়েদের আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। একই দিন আদালত তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও (২৬) কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তদন্ত শেষ করে গত ২৪ মে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। একই দিনে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন চার্জশিটটি আমলে নেন।
এরপর গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করেন আদালত। মামলায় চার্জশিটভুক্ত ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে আজ এই রায় ঘোষণা করা হলো। দ্রুততম সময়ে এই রায় ঘোষণায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার ও রাষ্ট্রপক্ষ।