দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের ধীরগতি, ব্যাংকখাতের চাপ, শিল্পে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সংকট কাটাতে বড় ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্যাকেজের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বেসরকারিখাতকে সচল করা, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা এবং অন্তত ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা।
আজ শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ প্যাকেজের ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ ২০২৬’ শীর্ষক উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি এখন একাধিক চাপে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। যা ২০২৪ সালে নেমে আসে ৪ দশমিক ২ শতাংশে। আর আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে।
কেন এই প্রণোদনা?
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, ব্যাংক থেকে অর্থপাচার, আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়া এবং উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ইস্পাত, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদনখাতের অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, বড় আকারের ‘কাউন্টার-সাইক্লিক্যাল’ প্রণোদনা ছাড়া অর্থনীতিতে গতি ফেরানো কঠিন হবে। অর্থাৎ, যখন বেসরকারি বিনিয়োগ ও চাহিদা কমে যায়, তখন রাষ্ট্রীয় সহায়তার মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখার কৌশল নেওয়া হয়।
কোথা থেকে আসবে ৬০ হাজার কোটি টাকা?
প্রস্তাবিত এই প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে গঠিত পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মাধ্যমে। এই অর্থ তিন বছরের বেশি মেয়াদি আমানতের ভিত্তিতে ১০ শতাংশ সুদে সংগ্রহ করা হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে, যা সরকারি গ্যারান্টির আওতায় থাকবে।
সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবাখাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষি ও গ্রামীণ কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি এবং উত্তরবঙ্গ কৃষি হাবে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে স্টার্টআপ—সবার জন্য আলাদা তহবিল
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে পরিচালিত স্কিমগুলোতে ছোট উদ্যোক্তা ও নতুন কর্মসংস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিটে ৫ হাজার কোটি, চামড়া ও জুতা রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি এবং হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম, পরিবেশবান্ধব পণ্য, স্টার্টআপ ও সৃজনশীল অর্থনীতির জন্যও আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রবাসী কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্যও ১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ স্কিম থাকবে।
২৫ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য
এই প্যাকেজ থেকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯ লাখ কর্মসংস্থান হবে কৃষি ও গ্রামীণ খাতে। সিএমএসএমই খাতে ৫ লাখ, বন্ধ শিল্পকারখানায় ২ লাখ এবং কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে আরও ২ লাখ মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই প্রণোদনা বাস্তবায়িত হলে বন্ধ কারখানাগুলো আবার চালু হবে, রপ্তানি আয় বাড়বে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরে আসবে এবং মধ্যমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বাড়বে।