কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী আজ ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ। বাঙালির এক চির দুঃখী অথচ প্রবল বিদ্রোহীর ১২৭তম জন্মদিন। তিনি আমাদের প্রাণের কবি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। প্রায় শতবর্ষ ধরে বাঙালির বিরহ, আনন্দ, সুখ ও দুঃখের পরম সঙ্গী হয়ে আছেন তিনি। যুগে যুগে কেউ তাকে চিনেছে ‘বিদ্রোহী’ রূপে, আবার কেউ তাঁকে বরণ করেছে প্রেম, সংগীত আর সাম্যের মহান পূজারি হিসেবে।
তবে এই দ্রোহ আর সৃষ্টির আলোকচ্ছটার মাঝে কবির যে গভীর ব্যথাতুর অধ্যায় লুকিয়ে ছিল, তার অনেকটাই রয়ে গেছে নীরবতার আড়ালে। তিনি আমাদের জাতীয় কবি, আমাদের চেতনার বাতিঘর হলেও তাঁর নিজের জীবনটা ছিল যেন এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি।
বুকে তার ছিল শত জনমের তীব্র হাহাকার। ভালোবাসার বদলে পৃথিবী তাকে দিয়েছে কেবলই বঞ্চনা, কেউ যেন দেয়নি এতটুকু পরম আশ্রয়। কেন লাল রঙের খোঁজে হাত বাড়াতে হয় রামধনুর দিকে, কেন জোছনার সঙ্গে মেশাতে হয় চন্দনের রং—এমন আশ্চর্য সব উপমায় তিনি সাজিয়েছেন প্রিয়তমার মালা, তবু সেই প্রেম ধরা দিয়েও যেন দেয়নি ধরা। প্রণয়ের এই তীব্র দহনে বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন বিদ্রোহের নজরুল।
কাব্যের মসৃণ পৃথিবী নয়, বাস্তব জীবন কবিকে দেখিয়েছিল নির্মমতার পাহাড়। সেই বন্ধুর ও নির্মম পথে পা ফেলে সমাজ বদলের স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন ক্ষুরধার কলম। সাহিত্যের সমুদ্রে সৃষ্টির ঝড় তুললেও তাঁর অনেক স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত রয়ে গেছে অধরা।
শত সংগ্রামের মাঝেও তিনি আজীবন মানুষকে শুনিয়েছেন প্রেম, দ্রোহ আর মানবমুক্তির গান। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জীবনের মধ্যগগনেই নির্বাক হয়ে যাওয়ার এক চরম ব্যথা বুকে নিয়ে চিরতরে আড়ালে চলে যায় তাঁর একান্ত অভিমান। নিজেই তো আক্ষেপ করে লিখেছিলেন- “আমি চাঁদ নহি, অভিশাপ!”
কবির সেই নীরব হওয়ার পর কেটে গেছে বহু বছর, পৃথিবী বদলে গেছে অনেকখানি। তবু আজও জীবনের সব স্থবিরতার কালে, জাতীয় সংকটে কিংবা নিভৃত গোপন নিশীথে-বাঙালি পরম আশ্রয় খোঁজে তাঁরই সৃষ্টির চরণে। চেতনার সেই অপরাজেয় বাতিঘরের জন্মদিনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।