সম্পাদকীয় প্রতিবেদন
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটকে সরকার ‘সবার বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, এ বাজেট কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শ্রেণির জন্য নয়, বরং কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, নারী ও তরুণ সমাজসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করেই এটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
বাজেট-উত্তর বিভিন্ন বক্তব্যে অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং বৈদেশিক নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, করের চাপ হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণকে বাজেটের মূল অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতি ও উদ্ভাবনভিত্তিক খাতকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে পারে।
তবে বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়নের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, পরিকল্পনার একটি বড় অংশ ধীরগতিতে বাস্তবায়িত হয়। বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা বাজেট বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দেয়।
এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুর্নীতি ও অনিয়ম। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয়, ঠিকাদারি ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক স্তরে স্বচ্ছতার ঘাটতি বাজেটের কাঙ্ক্ষিত ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়, সময়ক্ষেপণ এবং গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যকারিতাকে দুর্বল করে। তাই বাজেট বাস্তবায়নের সফলতা নিশ্চিত করতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি।
তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নীতিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর। শুধু পরিকল্পনা নয়, সময়মতো ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে বাজেটের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কার না হলে বাজেটের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সৃজনশীল অর্থনীতিতে বরাদ্দ ও উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক দিক। এসব খাতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের বাজেট একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক রূপরেখা। তবে এর সফলতা নির্ভর করছে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। বাস্তবায়নের দুর্বলতা দূর করতে না পারলে বাজেটের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
শেষ পর্যন্ত বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে কাগজে নয়—বরং মাঠ পর্যায়ে এর স্বচ্ছ, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়নের মধ্যেই।