জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাসের পর এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে বিরোধীদল। বাজেটকে ‘অপরিকল্পিত, অস্বচ্ছ ও অবাস্তবায়নযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে তারা দাবি করেছে, সংসদে বিরোধীদলের আপত্তি ও চাপের মুখে সরকার কয়েকটি ‘গণবিরোধী’ প্রস্তাব সংশোধন বা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে।
মঙ্গলবার বাজেট পাসের পর সংসদ ভবন চত্বরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এ প্রতিক্রিয়া জানান বিরোধীদলের মুখপাত্র ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।
তিনি বলেন, “আমরা বাজেটের বিপক্ষে ভোট দিয়েছি। কারণ, এটি এক কথায় অপরিকল্পিত, অস্বচ্ছ এবং বাস্তবায়নযোগ্য নয়।”
বিরোধীদলের দাবি, তাদের গঠনমূলক সমালোচনার ফলেই বাজেটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে মুদিদোকানের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার, আবাসন খাতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের একটি বিতর্কিত বিধান বাদ দেওয়ার ঘোষণা এবং করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা নির্ধারণ।
তবে এসব পরিবর্তনের পরও বাজেটের মৌলিক দুর্বলতা রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা। তাদের প্রধান আপত্তি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়। তাদের মতে, যখন ব্যাংক খাতকে সচল রাখতে সরকারকেই সহায়তা দিতে হচ্ছে, তখন একই খাত থেকে এত বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এ ছাড়া একদিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং অন্যদিকে ব্যাপক ঋণ গ্রহণ ও অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির নীতিকে পরস্পরবিরোধী বলে উল্লেখ করেছে বিরোধীদল। তাদের আশঙ্কা, এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে।
সংসদে বিল উত্থাপনের প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে বিরোধীদল। তাদের অভিযোগ, কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী বিলের কাগজপত্র তিন দিন আগে সদস্যদের দেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে যেদিন বিল উত্থাপন করা হয়, সেদিনই নথি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে আইন প্রণয়নের আগে যথাযথ পর্যালোচনা ও অর্থবহ আলোচনা ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা মনে করে।
তবে নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইনকে সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে বিরোধীদল। যদিও আদালতের অনুমতি ছাড়াই কম্পিউটার ও সার্ভার জব্দের ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়ার বিষয়ে তারা আপত্তি জানিয়েছে। তাদের মতে, এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করার বিধান থাকা উচিত।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল শিক্ষা-সংক্রান্ত বিল নিয়েও বিরোধীদল আপত্তি জানিয়ে বলেছে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পর্যাপ্ত পর্যালোচনার পর সংসদে আনা উচিত ছিল। অন্যথায় উচ্চশিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সংবিধান সংশোধনের প্রসঙ্গে বিরোধীদলের বক্তব্য, শুধু সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ জন্য কার্যপ্রণালি বিধিসহ আরও কয়েকটি আইনের সংস্কার প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সদস্যদের সমন্বয়ে একটি সংস্কার কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও সরকার এখনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাজেটে কার্যকর কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি বলেও দাবি করেছে বিরোধীদল। তাদের মতে, নিহত ও আহত ব্যক্তিদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা থাকলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য পৃথক বাজেট বা সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার প্রতিফলন বাজেটে নেই।