বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অতিপরিচিত নাম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী এই হেভিওয়েট নেতা বর্তমানে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর মনোনয়ন ঘিরে যখন জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনা তুঙ্গে তখন সামনে এসেছে তাঁর পারিবারিক শেকড়ের গল্প।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঠাকুরগাঁও জেলার নাম। কিন্তু তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঠাকুরগাঁওয়ে হলেও অনেকেই জানেন না পৈতৃক শেকড়ের গল্প।
মির্জা ফখরুলের পৈতৃক নিবাস পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমীন ও চাচা মির্জা গোলাম হাফিজের জন্ম এই মির্জাপুরেই।
মির্জাপুর একটি গ্রামের নাম। এই নামেই নামকরণ হয় মির্জাপুর ইউনিয়নের। ফলে মির্জাপুর ইউনিয়নের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক মির্জা পরিবারের। এই গ্রামের সভ্রান্ত মির্জা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুলের বাবা মির্জা রুহুল আমীন। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘চোখা মিয়া’ নামে পরিচিত ছিলেন। শিক্ষকতা ও আইন পেশার পাশাপাশি রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তিনি বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি।
মির্জা রুহুল আমীনের ভাই মির্জা গোলাম হাফিজও ছিলেন জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ১৯২০ সালের ২ জানুয়ারি মির্জাপুর গ্রামে জন্ম নেয়া মির্জা গোলাম হাফিজ আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
পরে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি ভূমি প্রশাসক মন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
একই পরিবারের দুই ভাইয়ের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। একজন জাতীয় সংসদের স্পিকার ও মন্ত্রী হয়েছেন। অন্যজনও ছিলেন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। সেই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব, শিক্ষা জীবন ও বেড়ে ওঠা মূলত ঠাকুরগাঁওকে ঘিরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করার পর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
১৯৭৯ সালে তিনি তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বিএনপি’র রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ধাপে ধাপে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপি’র রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ২০০৯ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে বিএনপি’র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। এরপর রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর মনোনয়ন নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঠাকুরগাঁওয়ে হলেও মির্জা ফখরুলের পারিবারিক শেকড় পঞ্চগড়ের মির্জাপুরে। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমীন এবং চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ দু’জনেরই জন্ম এই গ্রামে। ফলে মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে পঞ্চগড়ের এই জনপদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।